শরিফুল হাসান
আমি এই ছেলে-মেয়েদের ধৈর্য্য দেখি। দেখি ন্যায্য দাবি আদায়ে তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান। গতকাল সারাদিন শান্তিপূর্ণ অবস্থানের পর আজও আগারগাঁওয়ে পিএসসির সামনে বিসিএস উত্তীর্ণ প্রার্থীদের লাগাতার অবস্থান চলছেই।
জানি না আজও চেয়ারম্যান মহোদয় পুলিশ প্রটেকশন নিয়ে পিএসসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন নাকি এই ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলবেন! গতকাল কিন্তু সারাদিন শান্তিপূর্ণ অবস্থান করছিলেন প্রার্থীরা। কিন্তু বিকাল ৪ টায় পিএসসির তিন গেটে অবস্থান নেয়া প্রার্থীদের পুলিশ জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়। এরপর পিএসসি কর্মকর্তারা পুলিশি পাহারায় একে একে বের হয়ে যান।
এসময় চাকরিপ্রার্থীরা তাদের দাবি আদায়ের পক্ষে স্লোগান দিতে থাকে, তবুও পিএসসির চেয়ারম্যান কিংবা অন্য কোনো কর্তারা এবিষয়ে কোনো কর্ণপাত করেনি। পিএসসির ইতিহাসে এ এক ন্যাক্কারজনক দিন হয়ে রইলো। পিএসসির জন্মলগ্ন থেকে দাবি আদায়ে এমন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়নি কোনো চাকরিপ্রার্থীদের।
ওদিকে রোবারের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ রাতে ছেলে-মেয়েদের জোরপূর্বক উঠিয়ে দেয় বলে জানিয়েছেন বিসিএস উত্তীর্ণরা। তবে দমে যায়নি তারা। আজ সোমবার সকাল ৯ টা থেকে বের পিএসসির সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে তাঁরা। আমি মনে করি পিএসসির উচিত কথা বলে এই ছেলে-মেয়েদের বিদায় করা। যে পিএসসি তাদের ভাইভা নিয়েছিল যে পিএসসি নিয়মিত ছেলে-মেয়েদের ভাইভা নেয় আজ সেই ছেলে-মেয়েদের মুখোমুখি হতে এতো ভয় কীসের ছেলে-মেয়েদের?
একইভাবে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে ভীষণ হতাশ এই ছেলে-মেয়েরা। মূলধারার অধিকাংশ গণমাধ্যমে তাদের খবর প্রকাশ করেনি। অবশ্য রাজনীতি বিনোদন এসবের ভীড়ে আমাদের তারুণ্য সবসময়ই গণমাধ্যমে অবহেলিত ছিলো। আগেও লিখেছি, গত ১৩ বছরে যে পিএসসি শিক্ষার্থীদের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল সেই পিএসসি আজ পরীক্ষার্থী বান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। আগামী নির্বাচনের আগে দেশের তরুণদের জন্য কেউ যেন নতুন সংকট তৈরি করতে চাইছে।
কিন্তু কেন? নন ক্যাডারে নিয়োগে পরীক্ষার্থী বান্ধব যে চর্চা চলছিলো আজ কেন কারা সেটা ধ্বংস করতে চাইছে? ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গত এক মাস ধরে এ নিয়ে আন্দোলন করছে। আন্দোলনের তৃতীয় দফায় তারা পিএসসির সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি নিয়েছে। দেশে এমনিতেই অনেক সংকট। নতুন করে আর সংকট তৈরির প্রয়োজন নেই। আশা করছি পিএসসি তাদের কথা শুনে দ্রুত সমস্যার সমাধান করবে।

ততোক্ষণে আমি আপনাদের একটু অতীতে ফেরাই।প্রথম শ্রেণীর সব চাকুরিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে দুর্ণীতি ও অনিয়ম বন্ধে বিসিএস থেকে নন ক্যাডারে নিয়োগের অসাধারণ একটা পদ্ধতি করেছিলেন পিএসসির দারুণ দূরদর্শী প্রয়াত চেয়ারম্যান সা’দত হুসাইন। বিষয়টি এতো অসাধারণ ছিলো যে সাবেক আরেক চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ দ্বিতীয় শ্রেণীর নিয়োগেও এই পদ্ধতির চর্চা শুরু করেন।
আর নিয়মিত নিয়োগের মাধ্যমে সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক বিষয়টিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে ক্যাডার পদের পাশাপাশি নন ক্যাডারের অনেক পদে বিপুল সংখ্যক ছেলে-মেয়ে বিসিএস পরীক্ষা দেয়া শুরু করে।৩৪ থেকে ৩৮ প্রতিটা বিসিএসে গড়ে দেড় থেকে ২০০০ ছেলে মেয়ে নন ক্যাডারে চাকরি পেয়েছে। সাদিক স্যার যখন বিদায় নেন আমি বলেছিলাম একদিন ছেলে মেয়েরা বুঝবে অন্যদের চেয়ে কেন তিনি আলাদা। আমার কথার সত্যতা যে এতো তাড়াতাড়ি আসবে বুঝতে পারিনি। আমার কাছে মনে হয় গতি হারিয়েছে একাধিক বিসিএসজটে আক্রান্ত এই পিএসসি।
আসল কাজ বাদ দিয়ে নন ক্যাডারের অসাধারণ পদ্ধতিকে নিয়ে ব্যস্ত তারা। দেখে মনে হয়, বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের ধারণা যেমন নেই ছেলে-মেয়েদের কথাও তারা ভাবে না। আচ্ছা পিএসসি কী জানে নন ক্যাডারের চাহিদা কীভাবে আসে? প্রতিটা বিসিএসের পর ছেলেমেয়েরা যেভাবে নানা দপ্তরে দৌড়ায় সেই সম্পর্কে কতোটা জানে এই পিএসসি? তাঁরা কী জানে না নন ক্যাডার নিয়োগ না হলে একটা গোষ্ঠী খুশি?
আর আজকে যে তারা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর পদের চাহিদা বিভাজনের কথা বলছে বর্তমান চেয়ারম্যান তাহলে কীসের ভিত্তিতে ৩৮ বিসিএস থেকে নন ক্যাডার দিলেন এ বছরের মার্চে?জানি না আসল স্বার্থ কী? মাঝে মধ্যে ভীষণ আফসোস লাগে আমাদের কর্তাদের জন্য! কেন কী কারণে তারা এসব করেন তারা কী জানেন।
নন ক্যাডারের নতুন যে পদ্ধতির কথা ভাবছে পিএসসি তাতে ছেলে মেয়েদের চাকরির পথ যেমন সংকুচিত হবে তেমনি নিয়োগ পরীক্ষার নামে বাণিজ্য বাড়বে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। আজকের চাহিদা যদি তাঁর বছর পর নিয়োগ পায় তাহলে কতো ধরনের জটিলতা তৈরি হবে সেটা কি পিএসসি জানে?আমার বেশ মনে আছে, সাদিক স্যার বিদায় নেওয়ার আগে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমাকে একটা সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন।
২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সেটি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, পিএসসির প্রতি তরুণ ও চাকরিপ্রার্থীদের যে আস্থা তৈরি হয়েছে সেটি ধরে রাখতে হবে। আজকে সেই আস্থার ভয়াবহ সংকট। মাত্র দুই বছরের মাথায় এখন সেই সাক্ষাতকারটা আজ ভীষণ প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। চাইলে পড়তে পারেন।
(https://bangla.thedailystar.net/node/173773) নন ক্যাডারের নিয়োগটিকে বিশেষ সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে বিদায়ী চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘এক বিসিএস থেকে যখন আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দিলাম, যখন হাজার হাজার ছেলেমেয়ে নিয়োগ পেল সবার আগ্রহ আরও বাড়লো।
তরুণরা মনে করলো, লেখাপড়া করে বিসিএস উত্তীর্ণ হলে একটি চাকরি হবেই। আর এর ফলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যোগ্য কর্মকর্তা পেয়েছে। এটা অব্যাহত রাখতে হবে।’আজকে সেটি অব্যাহত রাখার বদলে নতুর করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। বেড়েছে বিসিএসজট। সবকিছু মিলে ভয়াবহ সংকট। বিস্তারিত এখানে
https://www.ajkerpatrika.com/…/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6…এই সাক্ষাৎকারটাও দেখতে পারেন।https://fb.watch/gbtlSCb1i2/পিএসসির প্রতি অনুরোধ গত ১৪ বছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি যে আস্থা তৈরি হয়েছে সেই আস্থাটা ধরে রাখুন।
তারুণ্যের কথা শুনুন। পিএসসি চাইলে প্রকাশ্যে কোন উম্মুক্ত অনুষ্ঠান করতে পারে। সেখানে আমার গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলতে পারি। তারুণ্যের প্রতি অনুরোধ আলোচনা করুন। আমি বিশ্বাস করি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই পিএসসি আমাদের তারুণ্যকে বুঝবে।


