হ র তা ল – অ ব রো ধে না শ ক তা

Spread the love

এমন বর্বরতা কখনো দেখেনি পাটগ্রামবাসী

শরিফুল হাসান

তাণ্ডবের সাক্ষ্য দিচ্ছে পোড়া এই মাইক্রোবাসটি। ১৫ ডিসেম্বর জামায়াতের ডাকা হরতালে পাটগ্রাম পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাদের এলাহী ও তাঁর ভাই জাতীয় পার্টির উপজেলা আহ্বায়ক কুদরত-ই এলাহীর বাড়ি ও মাইক্রোবাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গতকাল তোলা ছবি । প্রথম আলো
তাণ্ডবের সাক্ষ্য দিচ্ছে পোড়া এই মাইক্রোবাসটি। ১৫ ডিসেম্বর জামায়াতের ডাকা হরতালে পাটগ্রাম পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাদের এলাহী ও তাঁর ভাই জাতীয় পার্টির উপজেলা আহ্বায়ক কুদরত-ই এলাহীর বাড়ি ও মাইক্রোবাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়। গতকাল তোলা ছবি । প্রথম আলো

বাংলাদেশের উত্তরের উপজেলা লালমনিরহাটের পাটগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি ছিল মুক্তাঞ্চল। এখান থেকেই পরিচালিত হতো ৬ নম্বর সেক্টরের কার্যক্রম। তাই এখানকার মানুষ কোনো সহিংসতা দেখেনি। স্বাধীনতার পর ৪২ বছরেও এই এলাকায় রাজনৈতিক কোনো সহিংসতা হয়নি। কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর জামায়াত-শিবিরের ডাকা হরতাল চলাকালে ১৫ ডিসেম্বর এখানকার আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অর্ধশত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কুপিয়ে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে।
হরতাল চলার সময় পুলিশের সঙ্গে সহিংসতায় মারা যান শিবিরের তিন কর্মী। চার দিন পর বাউরায় আওয়ামী লীগের জনসভাস্থলে হামলা করেন জামায়াত-বিএনপির কর্মীরা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় অর্ধশত মোটরসাইকেল।
হিমালয়ের কোলঘেঁষা পাটগ্রামে এখন তীব্র শীত। বিভিন্ন সড়কে টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী। পাটগ্রাম-বুড়িমারী-লালমনিরহাট, পাটগ্রাম-আউলিয়ারহাট-বুড়িমারী, পাটগ্রাম-দহগ্রাম, পাটগ্রাম-সরকারের হাটসহ বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে শত শত কাটা গাছের গুঁড়ি।
তীব্র শীতের মধ্যেই গতকাল শনিবার দুপুরে হাজির হলাম হামলার শিকার ইব্রাহিম মিয়ার বাড়িতে। চারপাশে ভস্মীভূত খাট, বাড়ির গাছগুলোও পোড়া।
ইব্রাহিম জানালেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাঁর ও তাঁর পাঁচ ছেলের সাতটি ঘর, ৩৫০ মণ ধান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিন ছেলের ঘরের ভিটেমাটিটুকুই কেবল আছে।
ছোট ছেলে জমিনুর ভ্যানচালক। আহাজারি করে তিনি বলেন, ‘বাড়িতে আগুন দিয়ে হামলাকারীরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। আমরা নেভাতে গেলে মারধর করেছে। ওরা আমার ভ্যানটাও পুড়িয়ে দিয়েছে।’
আরেক ভাই জাহেদুলের স্ত্রী আসমা খাতুন বলেন, ‘এই শীতের মধ্যে একটা ঘরে আমরা খড় বিছিয়ে থাকি। বাকিরা পাশে এক আত্মীয়র বাড়িতে গিয়ে থাকে।’
ইব্রাহিম মিয়ার স্ত্রী বৃদ্ধা জরিতুন নেছা বলেন, ‘বাবা, হামরা কী করছি বাহে? কেনে ওমরা হামার বাড়িঘরলা পুড়ি ছাই করি দিল। মোর জীবনেও মাইনষির বাড়িঘরত এমন করি আগুন নাগাইয়া জ্বালাইবার দেখুনাই।’
ইব্রাহিম মিয়ার বাড়ির পাশেই তোফাজ্জল হোসেনের বাড়ি। সেটিও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল দেখা গেল, বাঁশ দিয়ে নতুন ঘর তোলা হচ্ছে। পাশেই ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাদের এলাহীর পাকা বাড়ি। ভবনের চারপাশে পোড়া দাগ। এই বাড়ির ছাদের টিন লাগানোর কাজ চলছিল গতকাল।
কাদেরের আরেক ভাই জাতীয় পার্টির উপজেলা আহ্বায়ক কুদরত-ই এলাহীর বাড়ির ফ্রিজ, টিভি, আলমারি এবং বাড়ির সামনে রাখা একটি মাইক্রোবাস পুড়ে ছাই হয়ে আছে।
কুদরত-ই এলাহী বলেন, ‘আমরা দুই ভাই শিক্ষকতা করি। আরেক ভাই একটা কলেজের অধ্যক্ষ। জামায়াত-শিবিরের কয়েক শ লোক এসে আমাদের চার ভাইয়ের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আমি প্রাণভয়ে আরেক বাড়িতে আশ্রয় নিই। চোখের সামনে নিজের বাড়িঘর জ্বলতে দেখতে হলো।’
কুদরত বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তাম। তখন থেকে শুরু করে গত ৪২ বছরে পাটগ্রামবাসী এমন সহিংসতা দেখেনি।’
এলাকার লোকজন জানান, ১৮-দলীয় জোটের ডাকা প্রথম ৬০ ঘণ্টা হরতালের প্রথম দিন গত ২৬ অক্টোবর প্রথম তাণ্ডব শুরু করে জামায়াত-শিবির। সে দিন বাউরা ইউনিয়নের সফিরহাট বাজারের ১৬টি ও বাউরা বাজারে হিন্দুদের তিনটি দোকান ভাঙচুর করা হয়। আগুন দেওয়া হয় বুড়িমারী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে।
একই দিন শ্রীরামপুর ইউনিয়নের আওলিয়ারহাট, কাউয়ামারী ও দহগ্রাম ইউনিয়নেও চলে ভাঙচুর। ৪ নভেম্বর হরতাল চলাকালে পাটগ্রাম পৌরসভার ধরলা সেতু এলাকার সোহাগপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নাসির উদ্দিন (২২) নামের ছাত্রদলের স্থানীয় এক নেতা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
স্থানীয় লোকজন জানান, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর সহিংস হয়ে ওঠে জামায়াত-শিবির। রায় কার্যকরের রাতেই বুড়িমারী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মুসা আলীর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ১৪ ডিসেম্বর শিমুলতলী এলাকায় পুড়িয়ে দেওয়া হয় ট্রাক।
১৫ ডিসেম্বর ভোরে জামায়াতের হরতাল চলাকালে পাটগ্রামের সরেয়ার বাজার এলাকায় জামায়াত-শিবির শতাধিক গাছ কেটে পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন সড়ক আটকে দেয়। সরেয়ার বাজার এলাকায় অবরোধ সরাতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালায় জামায়াত-শিবির। ওই সংঘর্ষেই শিবিরের কর্মী মনিরুল, আবদুর রহিম ও সাজু মিয়া মারা যান।
এর জের ধরে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সরেয়ার বাজার এলাকায় পাটগ্রাম পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড আনসার-ভিডিপির কমান্ডার আমিনুর রহমানের বাড়ি, চালকল ও চাতাল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আগুন দেওয়া হয় ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাদের এলাহী ও তাঁর চার ভাইয়ের বাড়িতে। আগুন নেভাতে গেলে ৬ নম্বর ওয়ার্ড অওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মিন্টু মিয়াকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এর জের ধরে বুড়িমারী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আছির উদ্দিন ও জামায়াতের নেতা এরশাদ হোসেনের বাড়িতে আগুন দেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এর পরই বেলা দুইটা থেকে এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
চতুর্থ দফা অবরোধের শেষ দিন ১৯ ডিসেম্বর বাউরা পাবলিক উচ্চবিদ্যালয়ে মাঠে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেনের নির্বাচনী সভায় যোগ দেওয়া নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায় জামায়াত-শিবির। সেখানে ৪২টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় ২২টি মামলায় অজ্ঞাত আট হাজার জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেকেই এলাকায় থাকছেন না। তবে পাটগ্রামের কাফিরবাজার, ঘোষপাড়া, ডাঙ্গিপাড়, বগুড়াপাড়া ও দয়ালেরটারি এলাকার লোকজন জানান, এ কয়টি এলাকায় জামায়াত-শিবির ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাহারা দিচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগ ও হিন্দুসম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, পাটগ্রাম বরাবরই শান্তিপ্রিয় এলাকা হিসেবে পরিচিত। কখনোই এখানে সহিংসতা হয়নি। কিন্তু এবার জামায়াত-শিবির সারা দেশের সুনির্দিষ্ট কতগুলো জায়গার পাশাপাশি পাটগ্রামেও সহিংসতা শুরু করেছে। এখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষ এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চায়।
জানতে চাইলে পৌর জামায়াতের সেক্রেটারি সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ আমাদের মিছিলে বিনা কারণে গুলি চালালে তিনজন কর্মী মারা যান। এরপর নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে মিছিল করেন। সেখান দিয়ে উচ্ছৃঙ্খল কেউ কেউ হয়তো কারও বাড়িঘরে হামলা চালাতে পারে। কিন্তু সেটা আমাদের অজান্তে হয়েছে।’
পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। সহিংস ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখন পর্যন্ত ২২ জনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। সামনে যাতে পরিস্থিতি আর খারাপ না হয়, সে ব্যাপারেও আমরা সতর্ক আছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.