নির্বাচনী পরিবেশ ম্লান
শরিফুল হাসান
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বরিশাল বিভাগে নির্বাচনী সহিংসতায় এখন পর্যন্ত চারজন নিহত হয়েছে। আহত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৩০০। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই যেন বাড়ছে সহিংসতা।
গত ১০ দিন বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে ঘুরে ভোটারদের মাঝে উৎসাহ কমই দেখা গেল। ভোটারদের অনেকের সন্দেহ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা যেকোনো উপায়ে জেতার চেষ্টা করছেন। সেখানে বিএনপি তো দূরের কথা, নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদেরও কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছেন না তাঁরা। মাঠের চিত্রও অনেকটা তা-ই বলছে।
বিভাগীয় নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২২ মার্চ এই বিভাগের ছয়টি জেলায় ২৭২টি ইউনিয়নে ভোট হচ্ছে। এতে চেয়ারম্যান পদে ১ হাজার ৩৩২ জন, সাধারণ সদস্য পদে ৯ হাজার ৯৯৯ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ২ হাজার ৮৭৬ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন।
তবে কিছু জায়গায় সহিংসতা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি পুলিশের বরিশাল বিভাগের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে অতিরিক্ত পুলিশের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার বিষয়ে আশাবাদী।’
বরিশাল: এই জেলার বানারীপাড়া, উজিরপুর, বাকেরগঞ্জ ও গৌরনদীতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ বার আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষ হয়েছে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সঙ্গেও। এসব ঘটনায় অন্তত ৭০ জন আহত হয়েছে।
বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ বিভিন্ন স্থানে নিজেরা যেমন মারামারি করছে, তেমনি বাকেরগঞ্জ, গৌরনদীসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁদের কর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে। তিনি পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের দাবি করেন।
পিরোজপুর: পিরোজপুরের ৪২টি ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে সংঘর্ষে গত মঙ্গলবার নাজিরপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুল হক মারা গেছেন। তিনি স্থানীয় শেখমাটিয়া ইউপি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী তৌহিদুল ইসলামের ভাগনে।
মঠবাড়িয়ার গুলিসাখালী বাজারের চায়ের দোকানি আবু সুমন প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০ বছর ধরে দোকান করছি। প্রতি নির্বাচনের আগেই লোকজনের কথাবার্তা শুনি। এবার সবার একটাই কথা, আওয়ামী লীগ সব নিয়ে যাবে। লাশ পড়বে।’
এই গুলিসাখালী ইউনিয়নে ৫ মার্চ ক্ষমতাসীন দলের হামলায় বিদ্রোহী প্রার্থীর ২০ জন আহত হন। ৭ মার্চ মঠবাড়িয়া উপজেলার হলতা গুলিসাখালী ইউনিয়নের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী হারুন আল রশিদের প্রচার মাইক ভাঙচুর করেন সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকেরা।
নেছারাবাদ উপজেলার দৈহারি ইউপিতে বৃহস্পতিবার রাতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছে।
পটুয়াখালী: এই জেলায় নির্বাচনী সহিংসতায় একজন নিহত হওয়া ছাড়াও গত এক সপ্তাহে অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছে। জেলার আটটি উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে। এর মধ্যে ৪০টিতেই রয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী। বাউফলের আদাবাড়িয়া ইউনিয়নে গত সোমবার আওয়ামী লীগের মূল ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি আশ্রাফ ফকির মারা যান। তিনি চেয়ারম্যান প্রার্থী সামসুল হক ফকিরের চাচাতো ভাই। এ ঘটনা নিয়ে মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও মারামারি হয়।
বাউফলেরই আরেক ইউনিয়ন নাওমালায় সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৩০ জন আহত হয়েছে।
রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী নাজমুল হুদার বসতঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ৫ মার্চ দুপুরে এই ঘটনার আগে ৩ মার্চ দুই প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে ২০ জন আহত হন।
বরগুনা: বরগুনার পাঁচটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে। এর মধ্যে ১৯টিতে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে সদর ও আমতলীতে বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ২২ ফেব্রুয়ারি আমতলীর হলদিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে বশির উদ্দিন নামে একজন (৩৫) মারা যান।
গত সোমবার সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী সফিকুজ্জামানের সমর্থকদের ওপর আওয়ামী লীগের প্রার্থী হুমায়ুন কবিরের সমর্থকেরা হামলা চালালে অন্তত ২৫ জন আহত হন।
ভোলা: ভোলার সাতটি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে। এর মধ্যে অন্তত ৩০টিতে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এখানকার বিদ্রোহী প্রার্থীদের অভিযোগ, যেকোনো মূল্যে তাঁদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে নানাভাবে হুমকি ও চাপ দেওয়া হচ্ছে।
সদর উপজেলার বাপ্তা ইউপিতে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়ানুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার ভোর রাতে তাঁর নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। পরে গুলি ও বোমা ফাটিয়ে পালিয়ে যায়।
সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নে নির্বাচনী সহিংসতায় আহত একজন বৃহস্পতিবার রাতে মারা গেছেন।
ঝালকাঠি: ঝালকাঠিতে এখন পর্যন্ত কোথাও বড় ধরনের সংঘাত হয়নি। তবে এখানে বিএনপি প্রার্থীরা কোণঠাসা। নলছিটি উপজেলার দুটি ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। এখানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা হামলার শিকার হচ্ছেন। ৩ মার্চ নলছিটির সুবিদপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আমির সোহেলের প্রচারণায় হামলা চালিয়ে মাইক ভাঙচুর করা হয়। একই ঘটনা ঘটেছে দপদপিয়া ইউনিয়নেও। গত বুধবার সন্ধ্যায় এই ইউনিয়নের ভরতকাঠি গ্রামে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. মিজানুর রহমানের উঠানবৈঠকে হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়।
তবে নলছিটি থানার ওসি মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ প্রতিটি এলাকায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। আশা করছি পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ থাকবে।’