শরিফুল হাসান
নয় মাস আগে বাংলাদেশ থেকে ১৫ লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণাটি এসেছিল মালয়েশিয়ার কাছ থেকে। দেশটির ট্রেড ইউনিয়নসহ সবাই এর বিরোধিতা করলেও সিদ্ধান্তে অনড় ছিল মালয়েশিয়া। অনুমোদন দিয়েছিল দেশটির মন্ত্রিসভাও। তবে এ বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি কর্মী নেওয়ার সেই সমঝোতা সইয়ের ১২ ঘণ্টার মধ্যেই দেশটি জানায়, এই মুহূর্তে তারা কোনো কর্মী নেবে না। গতকাল শনিবার মন্ত্রিসভাও এর অনুমোদন দিয়েছে।
অর্থাৎ ১৫ লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণার শুরু আর শেষ দুটিই হলো মালয়েশিয়ার মাধ্যমে। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে প্রতিটি ঘোষণাই দিয়েছেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আহমাদ জাহিদ হামিদি।
মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, ১৫ লাখ কর্মী নেওয়ার মতো কোনো বাস্তবতাই ছিল না। কিন্তু জাহিদ হামিদি এই ঘোষণা দেন। বাংলাদেশও এমন ঘোষণায় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রাপ্তি শূন্য। বরং একটি চুক্তি করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি বাতিল করা শুধু অসৌজন্য নয়, একটা রাষ্ট্রকে অপমান করাও।
অভিবাসন-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর চেয়ারপারসন অধ্যাপক তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৫ লাখ লোক নেওয়ার কথা মালয়েশিয়াই বলেছিল। বাংলাদেশও নানাভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে মালয়েশিয়াকে ছাড় দিয়েছিল। কিন্তু চুক্তি করার পরদিনই মৌখিকভাবে এবং এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করাটা কেবল অসৌজন্যই নয়, বাংলাদেশকে অপমানও করা। এ যেন বাংলাদেশের সঙ্গে পুতুলখেলা।’
অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা এশিয়ার বেসরকারি সংস্থাগুলোর জোট কারাম এশিয়ার সদর দপ্তর মালয়েশিয়ায়। প্রতিষ্ঠানটির সমন্বয়ক হারুন আল রশিদ গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছরের জুনে যখন জাহিদ হামিদি এই ঘোষণা দেন, তখন প্রথম আপত্তি ওঠে মালয়েশিয়া থেকেই। মালয়েশিয়ার ট্রেড ইউনিয়নগুলো রীতিমতো বিরোধিতা করে। কারণ, মালয়েশিয়ার এত কর্মীর প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারপরও দেখা গেল, লোক আনার প্রক্রিয়া থেমে নেই। বরং অনলাইনে নিবন্ধন-প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণের জন্য রিয়াল টাইম নেটওয়ার্ক নামে একটি প্রতিষ্ঠান হলো। রাতারাতি গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মালিক উপপ্রধানমন্ত্রী জাহিদ হামিদির ভাই আবদুল হাকিম হামিদি। বিষয়টা জানাজানির পর আবার সমালোচনা শুরু হলো মালয়েশিয়ায়।’
হারুন আল রশিদ বলেন, ‘এরপর হামিদি সিনারফ্ল্যাক্স নামের আরেক প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেটি নিয়েও সমালোচনা উঠল। এক কথায় বলতে গেলে ১৫ লাখ কর্মী নেওয়ার চেয়ে বাণিজ্যটাই মুখ্য ছিল।’
১৫ লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণার উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, গত বছরের মে মাসে থাইল্যান্ডে এবং পরে মালয়েশিয়ায় গণকবর পাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে মানবপাচার নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারিভাবে (জিটুজি) কর্মী নেওয়ার বদলে বেসরকারিভাবে কর্মী নেওয়ার প্রস্তাব দেয় মালয়েশিয়া। ওই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ২৩ জুন তৎকালীন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন মালয়েশিয়ায় যান। ২৪ জুন তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাহিদ হামিদির সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেই জাহিদ হামিদি প্রথম ১৫ লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমেও সেদিন জাহিদ হামিদিকে উদ্ধৃত করে এই খবর প্রকাশিত হয়।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব বেগম শামসুন্নাহার গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই ১৫ লাখ নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। তবে তাদের মন্ত্রিসভা যে চুক্তি বাতিল করেছে সেটি আমরা জেনেছি। আমরা এখন নিজেরা কথাবার্তা বলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব।’



