‘আর্লি স্টেজ স্টার্টআপ’ ক্যাটাগরিতে সেরার পুরস্কার পেয়েছে জাহাজী

Spread the love

শরিফুল হাসান

এসএসসি, এইচএসসি, টিএসসি-জীবনে ডিগ্রি এই তিনটাই। জীবন যাপনের নয়, উদযাপনের। কেন কী কারণে শুরুর এই দুটো বাক্য লিখেছি সেটা যারা জানেন তারা জানেনই, যারা জানেন না তারাও কিছুক্ষণ পর জেনে যাবেন। যে কারণে এই লেখা সেটা হলো, দেশসেরা উদ্যোক্তার পুরস্কার পেয়েছে জাহাজী। ফেসবুক কিংবা গণমাধ্যমের খবরে আপনারা অনেকেই হয়তো খবরটা দেখে থাকবেন।

আজ বরং এই খবরের নায়কদের গল্প বলি। কাজল, অভিদের গল্প। গত ১৬ বছরে এই ঢাকা শহরে, এই বাংলাদেশে,এই পৃথিবীতে আমার বা আমাদের কিছু মানুষের খুব ঘনিষ্ঠ ছোট ভাইদের একজন এই Kajal Abdullah। প্রথম কবে ছেলেটিকে দেখেছিলাম আমার মনে নেই। তবে কাজলের বর্ণনামতে, ১৬ বছর আগে, ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম দেখা টিএসসিতে। নাটকীয় সেই গল্প আগে একবার বলেছি।

অন্য কোথাও আবার বলবো। তবে পরিচয়ের পর গত ১৬ বছরে কতো শতোবার আমরা একসঙ্গে আড্ডা দিয়েছি বলে শেষ করা যাবে না। ১/১১ এর কঠিন দিনগুলোতে, কখনো শাহবাগে. কখনোবা এই দেশের কোন পথে প্রান্তরে আমরা স্বপ্ন বুনেছি হতাশার গল্প থেকে। এই দেশ এই পৃথিবী নিয়ে আমরা কতো কতো আড্ডায় মেতেছি শেষ নেই। আসলে কোটি মানুষের এই ঢাকা শহরে আমাদের তো খুব বেশি বন্ধু নেই!

সংকটে বা আনন্দে দিনশেষে আমরা অল্প কিছু মানুষ। বিশেষ করে আমার সমবয়সী বন্ধু যতোজন, সিনিয়র বন্ধু তার চেয়ে অবশ্যই বেশি আর জুনিয়রদের সংখ্যা আরো বেশি। সেই তালিকায় কাজল সবার ওপরের দিকে। গত ১৬ বছরে কতো কতো ঘটনায় আমরা একসঙ্গে হেসেছি, কেঁদেছি বলে শেষ করা যাবে না।

গভীর রাতে আমরা একসঙ্গে রাতের আকাশ দেখতে দেখতে জীবন দর্শন নিয়ে যেমন কথা বলেছি, কথা বলেছি গান শুনতে শুনতে কিংবা এই দেশের সুন্দর কোন প্রকৃতি দেখে। আমরা প্রায়ই বলি, আমরা এখন আলাদা মায়ের পেটের আপন ভাই। এই বাংলাদেশ আর এই পৃথিবী নিয়ে আমাদের স্বপ্নের শেষ নেই। কাজলের কাছে ফিরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের ছাত্র কাজল সবসময় বলতো, আমার জীবনে ডিগ্রি তিনটা।

এসএসসি, এইচএসসি ও টিএসসি। তো সেই তিন ডিগ্রিধারী আমাদের ছোট ভাই কাজল কখনো বিবিসিতে খন্ডকালীন কাজ করে পুরোদমে চাকুরি শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুওয়াই প্রকল্পে। এরপর সেই চাকুরি ছেড়ে ব্র্যাকে। সেই কাজ ছেড়ে চলে গেল খুলনার গণহত্যা জাদুঘরের সরকারি দায়িত্ব নিয়ে।

কিন্তু সবাই যে চাকুরি করতে চায় সেই কাজল চাকুরি করবে কেন? একদিন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ওর বন্ধু অভির সঙ্গে মিলে শুরু করলো জাহাজী। অভির গল্পটাও দারুণ। কাজলের সূত্রেই ওর সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। কাজলের মতোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের ছাত্র। ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার ছিলো। চাকুরি ছেড়ে শুরু করলো ব্যাবসা।

সেই ব্যবসা করতে গিয়ে জাহাজে পণ্য ডেলিভারি নিয়ে ভয়াবহ সমস্যা দেখে সেই সমস্যার সমাধানে ভাবতে শুরু করলো Abhinandan Jotdar। এরপর কাজল আর অভি প্রতিষ্ঠা করলো জাহাজী। বছর পাঁচেক আগে এক জোছনার রাতে রূপসা নদীতে জাহাজে বসে প্রথম যখন জাহাজীর কথা শুনি দারুণ মুগ্ধ হয়েছিলাম! কী দারুণ এক ভাবনা জাহাজী!

নদীমাতৃক বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্যবাহী জাহাজ সেবার অ্যাপ জাহাজী। শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, কী দারুণ এক সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছে কাজল আর অভি। ওদের এই ভাবনায় জাহাজীকে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেয় বুয়েটের সরফরাজ। বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে খুলনাতেই ও শুরু করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।

কাজল-অভি আমাকে বলেছে, নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাই একসময় ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা খুব একটা শৃঙ্খলায় আনা যায়নি। ফলে পণ্য নিয়ে রওনা করার পর মালিক যেমন জানেন না তার জাহাজ বা ট্রলারটি কখন কোথায় অবস্থান করছে, তেমনি গ্রাহকও জানেন না তার পণ্য কখন এসে পৌঁছাবে। এতে করে অর্থ ও সময়ের অপচয় হচ্ছে উভয় পক্ষেরই।

সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্যবাহী জাহাজের জন্য অ্যাপভিত্তিক বুকিং এবং ট্র্যাকিং সেবা দিচ্ছে জাহাজী। এই অ্যাপ ইনস্টল করে একজন সাপ্লায়ার বুকিং সেবার মাধ্যমে জাহাজ ভাড়া, জাহাজের অবস্থান ও ধারণক্ষমতা যাচাই করে লাইটার জাহাজ ভাড়া করতে পারবেন।

জাহাজের ও ট্রিপের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখতে পারবেন। জাহাজী একটি আইওটি ডিভাইসও তৈরি করেছে, যেটি বাংলাদেশে বানানো একমাত্র ডিভাইস, যা নৌপথের প্রায় সবখানে ডেটা ট্রান্সমিশন-সুবিধা দিতে পারে। অভ্যন্তরীণ জাহাজের কর্মীরা অ্যাপটি ব্যবহার করে চাকরিও খুঁজে নিতে পারেন।আমি ওদের ভাবনা শুনে বলেছিলাম, জাহাজী একদিন এই দেশকে বহু কিছু দেবে। আসলেও তাই।

গত পাঁচ বছরে কঠিন এক পথে হেঁটেছে জাহাজী। স্বীকৃতি পেয়েছে দেশে-বিদেশে। সর্বশেষ স্বীকৃতি হুয়াওয়ে আইসিটি ইনকিউবেটর ২০২২ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে চ্যাম্পিয়ন জাহাজী লিমিটেড। দেশীয় ১৮০টি স্টার্টআপ এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তিনটি ধাপ পেরিয়ে আইডিয়া রাউন্ড ও আর্লি স্টেজে মোট ২০টি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত পর্বের জন্য বিবেচিত হয়। শেষে এসে নৌপরিবহন খাতে ই-লজিস্টিকস ও প্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘আর্লি স্টেজ স্টার্টআপ’ ক্যাটাগরিতে সেরার পুরস্কার পেয়েছে জাহাজী।

পুরস্কার হিসেবে ৫ লাখ টাকা, ১ লাখ ২৫ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের হুয়াওয়ে ক্লাউড ক্রেডিট এবং এর উদ্যোক্তারা বিদেশের সফল স্টার্টআপগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন।এর আগে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিড স্পার্ক প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ার স্টার্টআপগুলোর মধ্যে বিজয়ী হয় জাহাজী।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে জাহাজীকে নিয়ে ফিচারও লেখা হয়েছে। আজকে ফের এই গল্পগুলো বলছি কারণ এই দেশের অধিকাংশ তরুণ যখন চাকুরির পেছনে ছুটছে তখন কাজল, অভি, সরফরাজরা চাকুরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করেছে ব্যাবসা। পরিবার সমাজ সবার চাওয়ার বিপরীতে উদ্যোক্তা হওয়ার পথটা ভীষণ অমসৃণ। তারপরও চলতে হবে এই পথেই। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে ডিজিটাল ইকো সিস্টেম তৈরি করতে পারবে Jahaji

সেই আশায় অনেক অনেক শুভ কামনা অভি, কাজলদের। আমি বিশ্বাস করি জাহাজী আরো বহুদুর যাবে। আর আমরা একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে ঘুরতে বলতে পারবো জীবন যাপনের নয় উদযাপনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.