সাগরযুদ্ধে বেঁচে দেশে ফেরা

Spread the love

শরিফুল হাসান

আকাশছোঁয়া অট্টালিকা আর প্রশস্ত সব সড়কের শহর কুয়ালালামপুর। এটি মালয়েশিয়ার রাজধানী। এই শহরের আন্তর্জাতিক বিমান–বন্দরটাও বিশাল। বিমানবন্দরের সামনের ফুটপাতে বসিয়ে রাখা হয়েছে শীর্ণকায় ৯৪ জন মানুষকে। সবার পরনে একই রঙের গেঞ্জি। খালি পা।
ঘড়ির কাঁটায় তখন মঙ্গলবার দিবাগত রাত একটা পেরিয়েছে। ওই ৯৪ জনের মধ্যে ১২ বছরের শিশু থেকে ৩৫ বছর বয়সী মানুষও আছেন। এঁরা সাগরযুদ্ধে বেঁচে ফেরা, সবাই বাংলাদেশি। কাউকে জোর করে, কাউকে ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখিয়ে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে ওঠানো হয়েছিল। সাগরপথের ওই যাত্রায় একের পর এক সহযাত্রীর মৃত্যু দেখেছেন তাঁরা। বেঁচে থাকলেও দুঃসহ সেসব স্মৃতি এবং মালয়েশিয়ার পুলিশের হাতে আটকের পর প্রায় দুই মাসের ‘বন্দী’ জীবনের স্মৃতি তাঁদের সারাক্ষণের সঙ্গী। এসব সঙ্গী করেই তখন তাঁদের অপেক্ষা চলছিল দেশে আপনজনের কাছে ফেরার।
রাতে উড়োজাহাজে উঠে গতকাল বুধবার সকালে দেশের মাটিতে পা রেখেছেন এই ৯৪ জন। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সূত্র বলেছে, এ নিয়ে সাগরপথে অবৈধভাবে আসা ২৫৪ জন দেশে ফিরলেন। আজ বৃহস্পতিবার ফিরবেন ৯৫ জন। কাল শুক্রবার ফিরবেন আরও ৯৬ জন। সব মিলিয়ে মালয়েশিয়ায় উদ্ধার হওয়া ৪৪৫ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরছেন। তাঁরা সবাই মানব পাচারের শিকার।
গতকাল দেশে ফেরা ৯৪ জন গত ১১ মে পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন মালয়েশিয়ার লংকাবি উপকূলে। এরপর ছিলেন বেল্লাতি ক্যাম্পে। সাগরে তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কথা জানতেই মঙ্গলবার রাতে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে যাওয়া।
রাত ১২টার পর পুলিশের পাহারায় দুটি বাস সেখানে এল। ওই বাস দুটিতেই ছিলেন ৯৪ বাংলাদেশি। পুলিশের অনুমতি নিয়ে বাসে উঠেই চমকে যেতে হলো। কারণ, তাঁদের সবার হাতে হাতকড়া। দেশে ফিরছেন, তবু এখনো অনেকের আতঙ্ক কাটেনি। ঈদের আগে দেশে ফিরতে পারছেন বলে স্বস্তিও দেখা গেল অনেকের চোখে-মুখে।
আতঙ্ক কাটেনি এমন একজন ঝিনাইদহের রাশেদুল ইসলাম (৩২)। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মাস চারেক আগে টেকনাফ থেকে ট্রলারে ওঠেন। এরপর মিয়ানমার সীমান্তের কাছে বড় জাহাজে উঠে রওনা হন মালয়েশিয়ার উদ্দেশে। জাহাজে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মিলে আট শতাধিক লোক ছিলেন। অনেক দিন সাগরে ভাসলেও তাঁদের জাহাজ কোথাও ভিড়তে পারেনি। এর মধ্যে খাবার ও পানির তীব্র কষ্টে অনেকে চোখের সামনে মারা যান। আবার দালালেরাও মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে কয়েকজনকে গলা কেটে সাগরে ভাসিয়ে দেয়।
রাশেদুলের পাশে থাকা ফরিদপুরের আমির হোসেন (১৮) জানান, একসময় জাহাজে থাকা সব খাবার ও পানি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু জাহাজ কোথাও ভিড়তে পারছিল না। একদিন দালালেরা ও জাহাজের মাঝি-মাল্লারা তাঁদের মালয়েশিয়ার কাছে সাগরে ফেলে স্পিডবোটে করে পালিয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে সবাই বাঁচার আশা ছেড়ে দেন, কান্নাকাটি শুরু করেন। এর তিন দিন পর মাছ ধরার একটি ট্রলার দেখেন। তাঁদের অনুরোধে ট্রলারের জেলেরা এক ড্রাম তেল ও দুই বস্তা চাল দেয়। এরপর জাহাজে থাকা কয়েকজন যাত্রী জাহাজ চালান। একসময় তাঁরা মালয়েশিয়ার উপকূলে আটক হন।
ঝিনাইদহের মেহেদি হাসান বলেন, তাঁরা অপর একটি ট্রলারে প্রায় পাঁচ মাস সাগরে ছিলেন। বাচ্চু মিয়া (২২) বলেন, ৯ মার্চ টেকনাফ থেকে তাঁরা ৪৬ জন মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। ৪৬ জনের মধ্যে তাঁরা কয়েকজন বেঁচে ফিরছেন।
আইনাল মাতবর, জসীমউদ্দিন, আলম খাঁ, গোলাপ মিয়াসহ আরও অনেকেই মৃত্যু থেকে বেঁচে ফেরার কথা বলতে চান। কিন্তু পুলিশ জানাল, সময় নেই। এঁদের উড়োজাহাজে তোলার সময় হয়েছে।
রাত তখন একটা পেরিয়েছে। হাতকড়া খুলে একেকজন করে বাস থেকে নামানো হলো এই বাংলাদেশিদের। এরপর সবাইকে বসানো হলো বিমানবন্দরের সামনের ফুটপাতে। এদের মধ্যে ২৩ জন কিশোর, একজন শিশু (১২)। শিশুটি বলল, তার নাম আবুল কালাম। বাড়ি কক্সবাজারের উখিয়ায়। মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে সে কী করে উঠল—এ প্রশ্নে সে বলে, সে হোটেলে কাজ করত। একদিন রাতে কাজ করে ফেরার সময় মাহবুব নামের এক দালাল হাত-পা বেঁধে তাকে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে তুলে দেয়। পাঁচ মাস সাগরে ভেসে মালয়েশিয়ায় এসে আটক হয়। চোখের সামনে দেখেছে কত মানুষের যন্ত্রণা আর মৃত্যু।
ভয়ংকর সেই দিনগুলোর কথা বলতে চাইছিলেন শওকত আলী, সোহেল রানা, সবুজ খান, রহমতউল্লাহ, মুবিনুর রহমানসহ আরও কয়েকজন। তবে তাঁদের ট্রাভেল পারমিট হয়ে যাওয়ায় সে সুযোগ হলো না।
এই ৯৪ জনকে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত এগিয়ে দেন বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম কাউন্সিলর সায়েদুল আলম। পরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশে ফেরা এই মানুষদের একেকজনের ঘটনা একেকটি বেদনার গল্প। কাউকে জোর করে তোলা হয়েছে, আবার অনেকে প্রলোভনে পড়ে উঠেছেন। তাঁদের দেখে আর কেউ যেন অবৈধভাবে সাগরপথে আসার চেষ্টা না করেন।
সায়েদুল আলম বলেন, মালয়েশিয়ার উপকূলে আটক ৭১৬ জন বাংলাদেশি বলে তাঁদের প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল। পরে তাঁদের তথ্য দেশে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত¯৪৪৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫৪ জন চলে গেছেন। বাকিরা আজ-কালের মধ্যে যাবেন। বাকি দুই শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তা হলে তাঁদেরও দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে।
রাত তখন দুইটা। গেঞ্জি-লুঙ্গি পরা মানুষগুলো খালি পায়ে সারি ধরে ইমিগ্রেশন পার হচ্ছে। বিমানবন্দরে নানা দেশের মানুষের অবাক চোখ ওই সারির দিকে। তবে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই সারির মানুষদের। নতুন জীবন নিয়ে তাঁরা এগোচ্ছেন দেশের দিকে, যেখানে অধীর অপেক্ষায় আছেন স্বজনেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.