বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে লোক যাওয়া বন্ধ চায় ইরাক
শরিফুল হাসান
সম্ভাবনাময় ইরাকের শ্রমবাজার নিয়ে আবারও আশাবাদী হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। তবে ইরাক সরকার সবার আগে ‘জিয়ারত’ ভিসায় (ভিজিট ভিসা) বা অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশ থেকে লোক পাঠানো বন্ধ দেখতে চায়। বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে ইরাককে সব ধরনের সহযোগিতা করার কথা বলেছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ইরাকের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তেলসমৃদ্ধ ইরাকের শ্রমবাজারে বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক বছর ধরে লোক পাঠানো বন্ধ। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে পুনর্গঠন কাজে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন। তবে সরকারের একটি প্রতিনিধিদল দেশটি ঘুরে আসার পর এককালের গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজার আবার চালু হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে কুর্দিস্তান কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে সমঝোতা স্বাক্ষর হওয়ার পরই কেবল এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইরাকে যায়। গত শুক্রবার প্রতিনিধিদলটি দেশে ফিরেছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, প্রবাসী কল্যাণ সচিব, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মহাপরিচালক এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন। প্রতিনিধিদল ইরাকে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণসহ অন্যান্য বিষয়ে দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রী, গৃহায়ণ ও নির্মাণমন্ত্রী, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উত্তর ইরাকের স্বশাসিত কুর্দিস্তান সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন। সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইরাক বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু। এবারের সফরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন আরও জোরদার হলো। কাজেই ইরাক নিয়ে আমরা অনেক আশাবাদী।’ ইরাকের শ্রমবাজারের সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক লোক দুবাই হয়ে জিয়ারত ভিসায় ইরাকে গিয়ে কাজের জন্য থেকে যান। এসব লোক ঠিকমতো বেতন পান না, নানা সমস্যায় পড়েন। ইরাক সরকার জিয়ারত ভিসায় লোক যাওয়া বন্ধ করতে বলেছে।’ খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়ায় ইরাক কিছু পরিবর্তন আনতে চাইছে। এখন দুই দেশের মধ্যে জনশক্তি রপ্তানিসহ অন্যান্য বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে। এরপর ইরাক তাদের জনশক্তির চাহিদার পরিমাণ জানাবে। বাংলাদেশ দূতাবাস সেই তথ্য যাচাই করবে। এরপর সেখানে লোক পাঠানো হবে। এ ছাড়া ইরাক সরকারিভাবে লোক নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি বৈধভাবে লোক যাওয়া শুরু হলে এমনিতেই ইরাকে অবৈধ পন্থায় লোক যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।’ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে ইরাকের শ্রম ও সামাজিকবিষয়ক মন্ত্রী নাসের আল-রুবাইয়ের বৈঠকে দুই দেশই একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হলে ইরাকের মন্ত্রী নাসের আল-রুবাই বাংলাদেশ সফরে আসবেন। এর পরই সবকিছু চূড়ান্ত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে ফের জনশক্তি রপ্তানি শুরু হতে কত দিন লাগতে পারে, জানতে চাইলে ইরাকে বাংলাদেশের শ্রম কাউন্সিলর জিয়াদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এর সুফল শিগগিরই বাংলাদেশ পাবে। সময় ধরে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে আমরা সমঝোতা স্মারকের জন্য খসড়া জমা দিয়েছি। এসব বিষয় চূড়ান্ত হলেই লোক পাঠানো শুরু হবে। এই প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস লেগে যাবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে ইরাকের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।’ ইরাকের কোন কোন খাতে লোক লাগবে, জানতে চাইলে জিয়াদুর রহমান বলেন, সবচেয়ে বেশি লোক দরকার নির্মাণ খাতে। এ ছাড়া প্লাম্বার, মেসন ও ইলেকট্রিশিয়ান দরকার। প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, ইরাকের সম্ভাবনাময় একটি জায়গা হতে পারে কুর্দিস্তান। সেখানে অনেক লোক লাগবে। কুর্দিস্তানের আঞ্চলিক সরকারও বাংলাদেশের মন্ত্রীকে এই বিষয়টি জানিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯০ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক অভিযানের পর সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে জনশক্তির ব্যাপক চাহিদার ভিত্তিতে ২০০৯ সালের অক্টোবরে ইরাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও শ্রম কাউন্সিলর নিয়োগ দেওয়া হয়। সে বছরের শেষদিকে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটিতে লোক পাঠানো শুরু হয়। ২০১০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত হাজার দুয়েক কর্মী ইরাকে গেলেও এখন দেশটিতে লোক পাঠানো বন্ধ। তবে অবৈধ প্রক্রিয়ায় বহু লোক গেছেন। বর্তমানে ইরাকে ১২ হাজার বাংলাদেশি কাজ করছেন।



