স্নাতক ডিগ্রির টাকা নিয়ে কর্তৃপক্ষ জানাল তাদের অনুমতি নেই
শরিফুল হাসান
বিমান চালনা বিদ্যায় প্রকৌশলী (অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার) হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন শহীদুল্লাহ তুষার। তাই দেশের একটি কলেজ যখন এই বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি চালুর ঘোষণা দেয়, তখন আগ্রহী হয়ে কলেজটিতে ভর্তি হন তিনি। খরচ করেন প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকৌশলী হওয়া তো দূরের কথা, এখন তাঁর শিক্ষাজীবনই হুমকির মুখে। কারণ, কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের ওই ডিগ্রি দেওয়ার অনুমতি নেই। তুষারের মতো অবস্থা অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীর। তাঁরা সবাই ভর্তি হয়েছিলেন রাজধানীর উত্তরায় কলেজ অব এভিয়েশন টেকনোলজিতে। গত বছর কলেজটির যাত্রা শুরু। কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের জানিয়েছিল, তারা ‘অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ বিএসসি ও ‘এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট’-এ বিবিএ ডিগ্রি দেবে। কিন্তু এক বছর পর শিক্ষার্থীরা জানতে পারেন, কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নয়। শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ সুমন সরকার তাঁদের বলেন, তাঁরা এখন ডিপ্লোমা সনদ দেবেন।হতাশ শিক্ষার্থীরা টাকা ফেরত চাইলে পুলিশের সামনে দলিলে অঙ্গীকার করে টাকা ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দেন অধ্যক্ষ। কিন্তু এখন তিনি উল্টো শিক্ষার্থীদের হুমকি দিচ্ছেন। কলেজের ছাত্র শহীদুল্লাহ তুষার, হারুনুর রশীদ, মোহাম্মদ তৌহিদ ও সব্যসাচীসহ অনেকে জানান, ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে তাঁরা তিন থেকে চার লাখ টাকা দিয়ে এই কলেজে ভর্তি হন। কলেজ কর্তৃপক্ষ শুরুতে অনেক ভালো ভালো কথা বললেও কিছুদিন আগে জানায়, তারা এখনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি পায়নি। বিষয়টি নিয়ে অধ্যক্ষের কাছে গেলে তিনি জানান, তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাইট অ্যারোনটিকাল ইনস্টিটিউট’-এর সনদ দেওয়া হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এর পক্ষেও কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজ কর্তৃপক্ষ যখন ডিপ্লোমা সনদ দিতে চায়, তখন তাঁরা প্রতিবাদ করেন। এরপর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে তাঁরা উত্তরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর পুলিশ এলে কলেজের অধ্যক্ষ সুমন সরকার গত ১১ নভেম্বর স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়, তিনি অবিলম্বে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকার চেক দেবেন। তিন মাসের মধ্যে অবশিষ্ট টাকা দিয়ে দেবেন। পুলিশের উপস্থিতিতে ৩০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ওই দলিলে সই করেন অধ্যক্ষ।শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই ঘটনার পাঁচ দিন পর অধ্যক্ষ তাঁর কক্ষে ডেকে তন্ময়, রাসেল ও সাব্বির নামের তিন ছাত্রকে বেদম পেটান এবং চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগে পুলিশে ধরিয়ে দেন। পরে কলেজের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করবে না—এই মর্মে মুচলেকা দিয়ে থানা থেকে তাঁরা ছাড়া পান। ঘটনার পর থেকে অধ্যক্ষ বলছেন, তিনি কোনো টাকা দেবেন না। উল্টো শিক্ষার্থীদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। কলেজ অব এভিয়েশন টেকনোলজির ওয়েবসাইটটি (www.catechedu.com) মুগ্ধ করার মতো। একের পর এক বিমান, বিমানের নানা কৌশলসহ একাধিক ছবি এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নানা কথা সেখানে উল্লেখ আছে। বলা হয়েছে, শিক্ষার মানের দিক থেকে এটিই সেরা কলেজ। কলেজের প্রসপেক্টাসে বলা হয়েছে, বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। এর পরও এই যুগে বিমান প্রকৌশলী কেন হওয়া দরকার, এর ভবিষ্যত্ কী—এসব গুণকীর্তন করা হয়েছে। প্রসপেক্টাসে বলা হয়েছে, এখান থেকে তরুণেরা আন্তর্জাতিক মানের বিএসসি ডিগ্রি পাবেন। কলেজের অ্যারোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ছয় লাখ ৯৬ হাজার টাকা এবং বিবিএ ডিগ্রির জন্য তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে।শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রসপেক্টাস ও ওয়েবসাইটে একের পর এক মিথ্যা বলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন কলেজের অধ্যক্ষ। এ কাজে তিনি সঙ্গে নিয়েছেন বিমানবাহিনীর সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তাকে। সব জায়গায় তিনি তাঁদের নাম ব্যবহার করেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক শিক্ষার্থী প্রতারিত হবেন। শিক্ষার্থীরা জানান, গত বছর চালু হওয়ার এক-দেড় মাস পরপরই নতুন নতুন একেকটি ব্যাচ ভর্তি করাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ফলে অনেক শিক্ষার্থীই প্রতারিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে কলেজের অধ্যক্ষ সুমন সরকারের তিনটি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিটিই বন্ধ পাওয়া গেছে। প্রসপেক্টাসের একটি নম্বরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি ফোন বন্ধ করে দেন। তবে কলেজের উপাধ্যক্ষ খান আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এটি সত্যি যে, তাঁদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নেই। তবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তাঁরা সনদ দেবেন। এ জন্য প্রথমে ডিপ্লোমা করতে হবে। পরে তাঁরা বিএসসি করতে পারবেন। ডিপ্লোমার জন্য ছয় লাখ ৯৬ হাজার টাকা নেওয়া যৌক্তিক কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, যৌক্তিক বলেই এই টাকা নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার এই বিষয়টি তদন্ত করছেন উত্তরা থানার উপপরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কলেজের অধ্যক্ষ স্বীকার করেছেন, তাঁদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুমতি নেই। তাই তাঁরা স্নাতক ডিগ্রি দিতে পারবেন না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে তাঁরা ডিপ্লোমা সনদ দেবেন। যেসব শিক্ষার্থী চলে যাবেন, তাঁদের পুলিশের সামনেই টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন অধ্যক্ষ। শিক্ষার্থীদের ৫০ হাজার টাকার চেকও দেওয়া হয়। এখন শিক্ষার্থীরা চাইলে প্রতারণার বিষয়ে অভিযোগ করে আদালতে যেতে পারেন।



