নাসিরনগরে মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা

Spread the love

‘ঘর না অয় সারাইলাম, মনের জ্বালা সারামু কেমনে?’

শরিফুল হাসান

গত ৩০ অক্টোবরের হামলায় ভাঙচুর করা হয় পূর্ণিমা দাসের টিনের ঘরটি। ভাঙাচোরা ঘরের মধ্যে গতকালও​ বসে ছিলেন তিনি। নাসিরনগরের কাশীপাড়া থেকে ছবিটি তুলেছেন সাইফুল ইসলাম
গত ৩০ অক্টোবরের হামলায় ভাঙচুর করা হয় পূর্ণিমা দাসের টিনের ঘরটি। ভাঙাচোরা ঘরের মধ্যে গতকালও​ বসে ছিলেন তিনি। নাসিরনগরের কাশীপাড়া থেকে ছবিটি তুলেছেন সাইফুল ইসলাম

এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যপট বদলায়নি। গত ৩১ অক্টোবর সোমবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কাশীপাড়ায় গিয়ে চোখে পড়েছিল বৃদ্ধা পূর্ণিমা দাসের টিনের ঘরের বেড়াটি কুপিয়ে ছিন্নভিন্ন করা। আর ঘরের ভেতর পুরো তছনছ। ছড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা আসবাব, হাঁড়িপাতিল, এমনকি বহু যত্নের হারমোনিয়ামটাও। গতকাল সোমবার ওই বাড়িতে গিয়েও একই চিত্র চোখে পড়ল।
ঘর সারার কাজ শুরু করেননি কেন জানতে চাইলে পূর্ণিমা দাস বলেন, ‘ঘর ঠিক করনের লাইগ্যা তিন বান টিন পাইছি। আর নয় হাজার টেহা দিছে। কিন্তু ঘর সারাইতে আরও টেহা লাগবে। ঘরের জিনিসপত্রও কেনা লাগবে। ঘর না অয় সারাইলাম, মনের জ্বালা সারামু কেমনে?’
চোখের সামনে সেদিনের তাণ্ডব দেখেছেন পূর্ণিমা। দল বেঁধে লোকজন এসে তাঁদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। বাড়িতে রাখা ছেলের বউয়ের দুই ভরি স্বর্ণসহ বাড়ির সব দামি জিনিসপত্র লুট করেছে। এমনকি তাঁর কানের দুলটাও খুলে নিয়ে গেছে। সেই দিনের কথা ভুলতে পারছেন না তিনি।
পাশেই কাশীপাড়ার নমিতা রানী দাসের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন তিনি ভাঙা রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর স্বামী ভানু দাস পেশায় জেলে। তিনি জানান, মাছ ধরা তাঁদের পেশা। তাঁর সব কটি জাল সেদিন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘর সারার জন্য দুই বান্ডিল টিন পেয়েছেন। কিন্তু জীবন চলবে কীভাবে?
এলাকার লোকজন জানালেন, গত কয়েক দিনে অনেকেই যৎসামান্য সাহায্য পেয়েছেন কিন্তু সবাই পাননি। তাই কাউকে দেখলেই সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য পাবেন এমন আশায় অনেকেই ছুটে এলেন।
কাশীপাড়ার মানিক দাস জানালেন, এলাকার প্রদীপ দাস, সুভাষ চৌধুরী, হরি মাধব, সবুজ চৌধুরী, বল্টু দাসসহ অনেকেই কোনো সাহায্য পাননি। অবনী মালাকার বলেন, তাঁর বাড়ি, বিশেষ করে রান্নাঘরটা তছনছ করা হয়েছে। তিনি এখনো সাহায্য পাননি। বৃদ্ধা মানুদা দাস জানালেন, তাঁর স্বামী নেই। ছেলের সঙ্গে থাকেন। একেবারেই অসহায় অবস্থায় আছেন।
মুসলমান হলেও সেদিনের হামলা থেকে রেহাই পাননি কাশীপাড়ার জাহিদ মিয়া। তিনি জানান, কাশীপাড়ায় তাঁর দোকান। সেদিন হামলাকারীরা এসে তাঁর দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট করে। আট দিন পরও দোকান চালু করতে পারেননি। পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে বিপদে পড়েছেন।
ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে গত ৩০ অক্টোবর সেখানে ১৫টি মন্দির ও শ খানেক বাড়িঘরে হামলা-লুটপাট চালানো হয়। এই অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া রসরাজ দাসের বাড়িতে গিয়ে কাল কাউকে পাওয়া যায়নি। দেখা যায়, ভাঙা বাড়ি। দরজা-জানালা সব খোলা। প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার পর থেকে রসরাজের পরিবারের কেউ বাড়িতে আসেননি। রসরাজের এক কাকি তিন দিন পর এলাকায় এলেও দ্বিতীয় দফা হামলার পর থেকে তিনিও এলাকায় নেই।
বাড়ির সামনেই কথা হয় হরিণবেড়ের স্থানীয় বাসিন্দা সুজন মিয়ার সঙ্গে। ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকার লোকজন এখনো আতঙ্কে আছে।
কাশীপাড়া থেকে একটু এগিয়ে গেলেই পশ্চিমপাড়ার জগন্নাথ মন্দির। এখানকার পুরোহিত নরেন্দ্র চক্রবর্তী বললেন, হামলাকারীরা মন্দিরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এক সপ্তাহ পরও মন্দিরের সংস্কারকাজ শুরু করতে পারেননি।
এলাকার লোকজন জানান, তাঁরা রাত জেগে এলাকা পাহারা দিচ্ছেন। প্রতিটি এলাকায় ১৮ জন করে তরুণ রাতে পাহারা বসান। আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের মহাপরিদর্শক এলাকা পরিদর্শন করবেন।
নাসিরনগর উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি আদেশ চন্দ্র দেব প্রথম আলোকে বলেন, ‘নানাজন কমবেশি সাহায্য করছে। আশা করছি, ধীরে ধীরে সবাই ঘুরে দাঁড়াবে। মানবতার স্বার্থেই এই মানুষগুলোর পাশে সবার দাঁড়ানো উচিত। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার। অনেকেই রাত জেগে এলাকা পাহারা দিচ্ছেন।’
জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টি পরিবারের মধ্যে আড়াই লাখ টাকা ও প্রায় এক শ বান্ডিল টিন বিতরণ করা হয়েছে। এর আগেও দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে মন্দিরসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে। আরও সাহায্য দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.