বোয়েসেলের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতিতে প্রার্থীদের ভোগান্তি
শরিফুল হাসান
জনশক্তি রপ্তানিকারক একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, এসব কারণে আট শতাধিক প্রার্থী দক্ষিণ কোরিয়া যেতে পারছেন না। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত হওয়া থেকে শুরু করে বিদেশ যাওয়া পর্যন্ত পদে পদে ভোগান্তিতে পড়ছেন তাঁরা। তবে বোয়েসেল (বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস) এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, কর্মী পাঠানোর বিষয়টি স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়ে থাকে।দক্ষিণ কোরিয়ায় একমাত্র বোয়েসেলের মাধ্যমে লোক পাঠানো হয়। ২০০৭ সালে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেমের (ইপিএস) আওতায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। ২০০৮ সাল থেকে কর্মী যাওয়া শুরু হয় সম্ভাবনাময় এ শ্রমবাজারে।বোয়েসেল সূত্র জানায়, দক্ষিণ কোরিয়া যেতে আগ্রহীদের এ পর্যন্ত দুবার ইপিএস পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে আট হাজার ২৭৮ জন উত্তীর্ণ হন। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন সাত হাজার ৯৩৫ জন। তাঁদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয় হাজার ৭২১ জনের চাকরির আমন্ত্রণ এসেছে। তবে ভাষা পরীক্ষার মেয়াদ ও বয়স শেষ হয়ে যাওয়ায় উত্তীর্ণদের মধ্যে ৮৫২ জন তালিকা থেকে বাদ পড়েন। চাকরির আমন্ত্রণ এলেও পাসপোর্ট এবং ভিসা সমস্যার কারণে বাদ পড়েন ১৪৬ জন।দেলোয়ার হোসেন, সাইফুদ্দিন নোমান, কামরুজ্জামান, মোহাম্মদ শাহজাহান, হারুন-অর-রশিদসহ বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, বোয়েসেলের দুর্নীতি ও অনিয়মের ফাঁদে পড়ে আট শতাধিক প্রার্থীর দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া আটকে গেছে। এর আগে বোয়েসেলের ডেটাবেসের সমস্যার কারণে হাজার খানেক প্রার্থীর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। এ নিয়ে আন্দোলন হলে তাঁদের আবার তালিকাভুক্ত করা হয়। তাঁরা জানান, বোয়েসেল থেকে প্রার্থীর ছবি, জন্ম-তারিখ, পাসপোর্ট নম্বর ইত্যাদি ভুল পাঠানোয় গত বছর দক্ষিণ কোরিয়া ১৮৬ প্রার্থীর নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়। তবে বাদ দেওয়ার আগেই কোরিয়া কর্তৃপক্ষ তালিকাটি সংশোধন করে পাঠানোর তাগাদাপত্র দিলেও তা করা হয়নি। কিন্তু ওই প্রার্থীরা অনশন শুরু করলে বোয়েসেল আবার তালিকা পাঠায়। এ ছাড়া যথাসময়ে তথ্য না পাঠানোয় ২৩৭ জনের ভাষা পরীক্ষার মেয়াদ পেরিয়ে যায়।ভুক্তভোগীরা বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া যেতে না পেরে গত জানুয়ারিতে ৪৯৩ তরুণ সংবাদ সম্মেলন করে বোয়েসেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। পরে তাঁদের ৪০৪ জন ৪ জুলাই থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনশন করেন। প্রবাসী কল্যাণসচিব তাঁদের অনশন ভাঙান।ওই তরুণেরা অভিযোগ করেন, দক্ষিণ কোরিয়া যেতে সরকার-নির্ধারিত খরচ ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা হলেও প্রার্থীকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ করতে হয়। তাঁদের একজন হারুন-অর-রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কাছে দুই লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু পাঠানো হয়নি। এ জন্য আমি বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছি।’বোয়েসেলের মহা-ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় লোক পাঠানোর পুরো বিষয়টি স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়ে থাকে। এখানে আর্থিক বা অন্য কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। দুই লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগে এক প্রার্থীর করা মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মামলা হলে আমাদের কাছে আদালতের কাগজ আসবে। আমরা কোনো কিছু পাইনি।’বাদ পড়াদের আন্দোলনের মুখে তাঁদের আবার তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁরা যখন আন্দোলন শুরু করেন, তখন আমরা তাঁদের বলেছিলাম, নিয়মের বাইরে কিছু করার নেই। কিন্তু পরে সংসদীয় কমিটির সুপারিশে মন্ত্রণালয় থেকে তাঁদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় চিঠি দেওয়া হয়। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, এসব আবেদনের ইতিবাচক সাড়া দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। একবার ইতিবাচক হওয়ায় সবাই এখন কিছু হলেই আন্দোলনের পথ বেছে নেন।’জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সভাপতি আবুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবকিছুতে খালি বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের গালাগাল করা হয়। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ায় লোক পাঠানোর নামে বোয়েসেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। সরকারের উচিত এসব বন্ধ করা।



