শরিফুল হাসান
বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে (বিবিআইএন) আগামী জানুয়ারি থেকে সরাসরি যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল শুরুর কথা থাকলেও সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গত সোমবার ঢাকায় চার দেশের মধ্যে বিবিআইএন মোটরযান চলাচল-সংক্রান্ত চূড়ান্ত রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি।
নেপাল-ভারতের মধ্যকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট এবং চুক্তি অনুসমর্থনে ভুটানের দীর্ঘসূত্রতা হঠাৎ করেই এই যান চলাচল শুরুর ব্যাপারে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই বিবিআইএনের জন্য মোটামুটি প্রস্তুত।
বাংলাদেশে তিন দিন অবস্থান শেষে গতকাল মঙ্গলবার এই শোভাযাত্রা কলকাতার উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছে। এর আগে চার দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারত মোটামুটি প্রস্তুত থাকলেও নেপাল ও ভুটান সরকার এখনো চুক্তি অনুসমর্থন করেনি। আবার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে মোটর শোভাযাত্রার নেপাল যাওয়ার কথা থাকলেও সেটি যায়নি। আবার শোভাযাত্রায় বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সরকারি কর্মকর্তারা থাকলেও ৫৮ সদস্যের বিশাল ভারতীয় বহরে সে দেশের কোনো সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না। এটিও বাকি তিন দেশের প্রতিনিধিদের কাছে দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। এ ছাড়া নেপাল ও ভুটানের প্রতিনিধিদের ধারণা, ভারত তিন দেশের চেয়ে শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েই বেশি আগ্রহী। যদিও বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগকেই প্রাধান্য দিতে চায়।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সন্দেহ আর সংশয়ের সব দেয়াল ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। গত সোমবার বিবিআইএন অবকাঠামো নিয়ে চার দেশের আলোচনার উদ্বোধনকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। গতকাল সংসদ ভবনে শোভাযাত্রাকে বিদায় দেওয়ার সময়ও তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘ইউরোপ যদি সীমান্তের সব বাধা অতিক্রম করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যেতে পারে, আমরা কেন পারব না?’
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ সরনও গতকাল বলেছেন, ‘এ যুগে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক যোগাযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এ অর্জনে আমরা সব বাধা অতিক্রম করব।’
তবে মৈত্রী শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এল ভিন্ন চিত্র।
এ বছরের ১৫ জুন ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে চার দেশের মন্ত্রীরা বিবিআইএন মোটরযান চলাচল-সংক্রান্ত রূপরেখায় স্বাক্ষর করেন। ৭ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বিবিআইএনের ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে যাত্রীবাহী যান চলাচলের খসড়া চূড়ান্ত হয়। সভায় অক্টোবর মাসের মধ্যে সবকিছু চূড়ান্ত করে এ বছরের মধ্যে চারটি দেশের মধ্যে বিবিআইএন-মোটর ভেহিক্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ছয়টি রুটও চূড়ান্ত করা হয়।
এ ছাড়া অক্টোবরে পরীক্ষামূলক যাত্রা এবং ১৪ নভেম্বর থেকে চার দেশের মধ্যে মোটর শোভাযাত্রা করার সিদ্ধান্ত হয়। কথা ছিল, নেপাল, ভুটান ও ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা হয়ে এই শোভাযাত্রা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। কিন্তু নতুন সংবিধানে নেপালের তরাই অঞ্চলের মদেশিয়দের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে এমন অভিযোগে আন্দোলন চলছে। মদেশিয়দের এই আন্দোলনে ভারতের সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ নেপালের। এ নিয়ে নেপাল-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। ফলে ১৪ নভেম্বর থেকে মৈত্রী শোভাযাত্রা হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি আর নেপালে যায়নি। এ ছাড়া নেপাল এখনো মোটরযান চলাচল-সংক্রান্ত চূড়ান্ত রূপরেখা সংসদে বা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করেনি। তবে মোটর শোভাযাত্রায় নেপালের চারজন প্রতিনিধি অংশ নেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিনিধিদলে থাকা নেপালের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ও নেপাল অটোমোবাইল স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দশরথ রিসিল প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোটর শোভাযাত্রা নেপালে যেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সেটি বর্তমান পরিস্থিতিতে শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়। তবে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই হবে।’
বিবিআইএন মোটরযান চলাচল-সংক্রান্ত চূড়ান্ত রূপরেখা কবে নাগাদ নেপাল অনুমোদন দিতে পারে, জানতে চাইলে দশরথ ও প্রতিনিধিদলের আরেক সদস্য প্রকাশ কাপুরি বলেন, এটি নিশ্চিত করা বলা সম্ভব নয়। খুব দ্রুতও হতে পারে। আবার দেরিও হতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর। তবে নেপাল বিবিআইএন নিয়ে খুবই আশাবাদী এবং চার দেশের মধ্যে যোগাযোগ চায়।
কূটনৈতিক সূত্র ও প্রতিনিধিদলে থাকা একজন বাংলাদেশি সদস্য বলেছেন, ভুটানও এখন বিবিআইএন-এর লাভ-ক্ষতি নিয়ে ভাবছে। ভুটানের মতো একটি ছোট দেশে এত যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি ঢুকলে কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটি তারা বিবেচনা করছে। ফলে ভুটান কিছুটা সময় নিতে চাইছে। তবে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে ভুটানের প্রতিনিধিরাও বিবিআইএনের ব্যাপারে তাঁদের আন্তরিকতার কথাই বলেছেন। ভুটান কেন এই চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেনি, জানতে চাইলে সে দেশের প্রতিনিধিদলের সদস্য থিনলে ওয়াংচুক বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে আগ্রহী এই চুক্তি কার্যকরের জন্য। ভুটানের সংসদে বিবিএন এমভিএ (মোটর ভেহিক্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট) উত্থাপন করা হয়েছে। সংসদ বিষয়টিকে আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বলেছে। আশা করছি গ্রীষ্মকালীন অধিবেশনেই এটি চূড়ান্ত হবে।’ তবে গ্রীষ্মকালীন অধিবেশন শুরু হতে জুন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে বলে জানা গেছে।
মৈত্রী শোভাযাত্রায় বাংলাদেশের ছয়জন, নেপাল ও ভুটানের চারজন করে আটজন এবং ভারতের ৫৮ জন প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু ভারতের পক্ষে কোনো সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৈত্রী শোভাযাত্রার আয়োজক ভারতের কলিঙ্গ মোটরসের কর্ণধার ওডিশার সাংসদ এবং ভারতীয় প্রতিনিধিদলের প্রধান প্রবীন চন্দ্র ভজ দেও প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরাই ভারত সরকারের প্রতিনিধি। আমরাই সরকারকে বার্তা পৌঁছাব। পুরো সফর নিয়ে আমরা সরকারকে একটা প্রতিবেদন দেব।’ তিনি মনে করেন, চার দেশের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভিসা একটা বড় সমস্যা। এর সমাধান কীভাবে হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চার দেশের মধ্যে মানুষে মানুষে যোগাযোগ যত বাড়বে, সম্পর্ক তত দৃঢ় হবে। আর ভিসা সমস্যা সমাধানের জন্য চার দেশের মধ্যে বিবিআইএন ভিসা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।’
কবে নাগাদ বিবিআইএন চালু হতে পারে, জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ পুরোপুরি প্রস্তুত। ভারতও প্রস্তুত। নেপাল বা ভুটান আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কিছুই জানায়নি। ৩ ও ৪ ডিসেম্বর কলকাতায় বৈঠক আছে। সেখানে অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে বলে আশা করছি।’



