পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পর্যটকের হিসাব নেই

Spread the love

তথ্য নিয়ে তুঘলকি!

শরিফুল হাসান


পর্যটক হিসেবে গত দুই বছরে কতজন বিদেশি বাংলাদেশে এসেছেন, সে তথ্য নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এই তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। কিন্তু তাদের কাছে দুই বছর ধরে এ তথ্য চেয়ে পাচ্ছে না খোদ সরকারের এই মন্ত্রণালয়।এসবির কর্মকর্তাদের দাবি, তাঁদের কম্পিউটারে যে সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা থেকে মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কম্পিউটার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের ন্যূনতম প্রযুক্তিজ্ঞান আছে, তাদের কাছে এ বক্তব্য হাসির খোরাক জোগাতে পারে। অবশ্য তথ্য আদান-প্রদানের এই ‘সমস্যা’ নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েকটি সভাও হয়েছে, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৫টি স্থলবন্দর ও তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশিরা বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের ব্যাপারে সব তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো তাদের কাছ থেকেই তথ্য নেয়। কিন্তু দুই বছর ধরেএসবি কোনো তথ্য দিচ্ছে না। এতে পর্যটন করপোরেশনের অনেক কাজও আটকে গেছে।বাংলাদেশে পর্যটন করপোরেশনের উপব্যবস্থাপক এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান এহছানুল কবির প্রথম আলোকে জানান, গত দুই বছরের তথ্য না পাওয়ায় করপোরেশন কোনো বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারছে না এবং এ-সংক্রান্ত অন্য কাজও আটকে আছে।বিদেশি পর্যটকদের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে কোনো তথ্য আছে কি না, জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব (পর্যটন-১) ফেরদৌসি আকতার গতকাল প্রথম আলোকে জানান, সর্বশেষ বৈঠকে এসবির কর্মকর্তারা বলেছেন, তথ্য দিতে হলে নতুন কম্পিউটার প্রোগ্রাম বানাতে হবে। এতে অনেক খরচ লাগবে। আরেকটি বৈঠক করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার জন্য পর্যটন করপোরেশন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না, জানতে চাইলে এহছানুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, অনেকবার এসবির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ চিঠিরই কোনো জবাব আসেনি। দপ্তরে গিয়েও এসবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। গত মাসে এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ে বৈঠকও হয়েছে। ওই বৈঠকে এসবির কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের সফটওয়্যার থেকে এ তথ্য করপোরেশনকে দিতে হলে নতুন আরেকটি প্রোগ্রাম বানাতে হবে। এটি অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। এহছানুল কবির আরও বলেন, ‘আমি একজন আইটি বিশেষজ্ঞও। একটি সফটওয়্যার থেকে তথ্য বের করা কঠিন কিছু নয়।’জানতে চাইলে পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘পর্যটন করপোরেশন ও মন্ত্রণালয় যেভাবে, যে ফরম্যাটে তথ্য চায়, এসবির কাছে সেই ফরম্যাটে তথ্য নেই। এ কারণেই তাদের তথ্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিদেশি একটি কোম্পানি এই সফটওয়্যার তৈরি করেছে। আমরা ওই কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি। এ বিষয়ে বৈঠকও হয়েছে। একটা সমাধান হয়তো হয়ে যাবে।’পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত তথ্য পেতে কী করা হবে, জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও পর্যটন) সরদার আবুল কালাম বলেন, এসবি, পর্যটন করপোরেশন ও মন্ত্রণালয়—সবাইকে নিয়ে বৈঠক হয়েছে। নতুন ফরম্যাট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব দেশে এলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে দেশের কম্পিউটারবিজ্ঞানী ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা প্রথম শুনলাম। খুবই লজ্জাজনক ব্যাপার। এ ক্ষেত্রে কেউ না-কেউ তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে না। এ কারণেই পর্যটন মন্ত্রণালয় তথ্য পাচ্ছে না।’জাফর ইকবাল বলেন, ‘পুলিশের সফটওয়্যারটি আমি দেখিনি। কিন্তু সাধারণ জ্ঞানে আমি এটুকু বুঝি, কতজন বিদেশি বাংলাদেশে এসেছেন, সে তথ্য কোনো না-কোনোভাবে রেকর্ড করা আছে। কাজেই যে সফটওয়্যারই হোক, সেখান থেকে এ তথ্য বের করা সম্ভব। পুলিশ বিভাগ যদি সেটা না পারে, তাহলে তাদের উচিত আলাদা কোনো প্রোগ্রামারকে এনে তথ্য বের করা। কারণ, একটি দেশের পর্যটন মন্ত্রণালয় সে দেশে আসা বিদেশির সংখ্যা জানবে না, এটি মেনে নেওয়া যায় না।’পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি কিছু বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে এসে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া অনেক বিদেশি পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে এসে চাকরি করছেন বলেও সরকারের কাছে অভিযোগ আছে।পর্যটন করপোরেশনের কাছে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আসা বিদেশিদের সংখ্যা আছে। ২০০৮ সালে দেশে পর্যটক এসেছেন চার লাখ ৬৭ হাজার ৩৩২ জন। তবে ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিবছর গড়ে দুই লাখ পর্যটক বাংলাদেশে এসেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.