প্রতিশ্রুত ট্রাইব্যুনাল হয়নি ১৫ মাসেও
শরিফুল হাসান
সমুদ্রপথে মানব পাচারের শিকার হয়ে মালয়েশিয়ায় আটকের পর গত বছরের ২০ অক্টোবর দেশে ফিরে আসেন কক্সবাজারের টেকনাফের মোরশেদ আলম, নরসিংদীর আল আমিন, হবিগঞ্জের মো. রোমানসহ ১১৫ জন বাংলাদেশি। সরকারি উদ্যোগে তাঁদের ফিরিয়ে আনা হলেও পাচারের সঙ্গে জড়িত কারোরই বিচার হয়নি। এমনকি মামলা পর্যন্ত হয়নি। আবার গত বছরের ১৩ মে সাগর থেকে ১১৬ জনকে উদ্ধারের ঘটনায় টেকনাফ থানায় একটি মামলা হলেও বিচারকাজ শুরু হয়নি।
শুধু এই দুটো নয়, মানব পাচারের ঘটনায় মামলা, তদন্ত ও বিচারের গতি সারা দেশেই হতাশাজনক। ২০১২ সালের মানব পাচার আইনের ২১ (২) ধারা অনুযায়ী, এই অপরাধসমূহ বিচারের জন্য দায়রা জজ কিংবা অতিরিক্ত দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারকের সমন্বয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করার কথা।
গত বছর সমুদ্রপথে মানব পাচার ও গণকবর নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে হইচই হওয়ার পর ২৭ মে সরকারের আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, মানব পাচার প্রতিরোধ ও পাচারকারী দমনে দেশের সাত বিভাগে সাতটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। কিন্তু সেটিও হয়নি। ফলে এখনো বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের মামলার বিচার চলছে। ফলে এ মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ প্রায় আটকে আছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বের মতো আজ ৩০ জুলাই বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এ উপলক্ষে গতকাল দেওয়া এক বাণীতে বলেন, মানব পাচার একটি ভিন্ন অপরাধ, যার শিকার সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশু। এটি বন্ধে প্রতিটি দেশকে কাজটা করতে হবে, বিশেষ করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে প্রায় দেড় লাখ লোক বঙ্গোপসাগর দিয়ে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন। এভাবে যেতে গিয়ে অন্তত দেড় হাজার মানুষ সাগরেই মারা গেছেন। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুই শতাধিক মরদেহ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর মানব পাচারের শিকার ২ হাজার ৮১৩ জন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে এনেছে সরকার, যাদের মধ্যে ১৮৩টি শিশু। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে ৯১১ জন, ইন্দোনেশিয়া থেকে ৭৬৪ জন, মালয়েশিয়া থেকে ৬৫৭ জন এবং থাইল্যান্ড থেকে ৪৮১ জনকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এখনো ইন্দোনেশিয়া থেকে ১৭ জন, মালয়েশিয়া থেকে ৮১ জন এবং মিয়ানমার থেকে ৭৬ জন দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
পাচারের শিকার হয়ে মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আসা সিরাজগঞ্জের আমিরুল ইসলাম, সিলেটের মাসুক মিয়া, মাদারীপুরের জামাল শেখসহ ১০ জনের সঙ্গে গতকাল এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে দালালেরা তাঁদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, তাদের কারও বিচার হলো না। পাচারকারীদের তালিকা করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান তাঁরা।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ জনকে পাচারের ঘটনায় সারা দেশে ৯৫৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ৬০৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু গত এক বছরে দুটো মামলায় মাত্র চারজনের শাস্তি হয়েছে। এর আগে ২০১২ সালে মানব পাচার আইন হওয়ার পর থেকে গত বছরের মে পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি (১,৫৯০) মামলা হয়। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯৮ শতাংশ মামলার এখনো বিচারকাজ শুরু হয়নি। মানব পাচার অপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন না হওয়ায় এই মামলাগুলো চলছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু এই আদালতগুলো নারী ও শিশু নির্যাতনের নিয়মিত মামলাগুলোর বিচার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মানব পাচারের মামলাগুলোর বিচার হচ্ছে না।
সারা দেশের মধ্যে মানব পাচারের অভিযোগে সবচেয়ে বেশি মামলা আছে কক্সবাজারে। সেখানে প্রায় ৪০০ মামলা আছে। কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নুরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কক্সবাজার থেকে প্রচুর মানুষ পাচার হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মামলাতেই মূল পাচারকারীদের নাম আসেনি। এমনভাবে কিছু নাম দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর ঠিকানা মেলে না। অধিকাংশ মামলার অভিযোগপত্রই জমা হয়নি। সব মিলিয়ে বলতে গেলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’
আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মানব পাচার ও দমন প্রতিরোধে গত বছরের জুনে দেশের সাত বিভাগে সাতটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয় অনুমোদন না দেওয়ায় এই প্রক্রিয়া আটকে যায়।
সরকারের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে তিন বছর মেয়াদি জাতীয় একটি কর্মপরিকল্পনা চলছে। ওই কর্মপরিকল্পনা পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটিও আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই কমিটির মূল দায়িত্ব পালন করে। ওই কমিটির সদস্য মনোয়ারা ইশরাত গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানব পাচার প্রতিরোধে সাত বিভাগে সাতটি ট্রাইব্যুনাল করার কথা থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মেলেনি। আমরা আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বলেছি যত দিন ট্রাইব্যুনাল হচ্ছে না তত দিন যেন বিশেষ পিপি নিয়োগ করে মামলা তদারকি করা হয়।’
মানব পাচার প্রতিরোধে আইন হওয়ার চার বছরেও ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা সময়ের কাজ সময়ে করি না, যার মাশুল জাতিকে দিতে হয়। যথাসময়ে বিচার না হলে তো অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। আমরা যদি মনে করি, মানব পাচার প্রতিরোধে আইন করে বিশাল কাজ করেছি, আর কিছু করার দরকার নেই, তাহলে তো হবে না। আইন হওয়ার চার বছর পরেও ট্রাইব্যুনালগুলো না হওয়া দুঃখজনক। আশা করি, এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা হবে।’



