মেধা ও কোটা আলাদা না করেই ফল
শরিফুল হাসান
৩৪তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদা করা হয়নি। এ কারণে মেধায় কতজন ও কোটায় কতজন রয়েছেন, প্রকাশিত ফলে তা স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া প্রার্থী না পাওয়ায় কোটার কতটি পদ সংরক্ষিত রাখতে হয়েছে, তা-ও উল্লেখ করা হয়নি।
গত শনিবার এই চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ৮ হাজার ৭৬৩ জন উত্তীর্ণ হন। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ১৫৯ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
২৭তম বিসিএস থেকে ৩৩তম পর্যন্ত সাতটি বিসিএসের মধ্যে ছয়টিতে মেধা ও কোটা আলাদা করে ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। ৩২তম বিসিএস শুধু কোটার জন্য ছিল।
বিভিন্ন কোটার কয়েকজন প্রার্থী বলছেন, এবার ফলে মেধা ও কোটা উল্লেখ না করায় কোটা পুরোপুরি মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। আর কোটায় নন এমন কয়েকজন প্রার্থী বলছেন, মেধা ও কোটা আলাদা করলে স্বচ্ছতা থাকত।
অবশ্য সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) সূত্র বলেছে, ফল দ্রুত প্রকাশ করার স্বার্থে এটি করা হয়েছে। মেধা ও কোটা বিষয়ে তথ্য তাঁদের কাছে আছে। নিয়োগের সময় চূড়ান্ত সুপারিশে তা উল্লেখ থাকবে।
বিসিএসে মেধায় ৪৫ শতাংশ এবং বিভিন্ন কোটায় ৫৫ শতাংশ নিয়োগ হয়ে থাকে। মেধার চেয়ে কোটা বেশি থাকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কও উঠেছে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব সা’দত হুসাইন পিএসসির চেয়ারম্যান হওয়ার পর ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০তম বিসিএসের ফল প্রকাশের সময় কোন ক্যাডারে মেধায় কতজন ও কোটায় কতজন নিয়োগ পেয়েছেন তা উল্লেখ থাকত। তিনি অবসরে যাওয়ার পরও এ ধারা অব্যাহত ছিল।
২৭তম বিসিএসের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেবার প্রশাসন ক্যাডারে মেধায় ১৩৪ জন এবং বিভিন্ন কোটায় ১৫৫ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। পুলিশ ক্যাডারে মেধায় ৬৮ এবং কোটায় ৭৯ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। পররাষ্ট্র, করসহ প্রতিটি ক্যাডারেই মেধা ও প্রাধিকার কোটায় নিয়োগের সংখ্যা আলাদা করা ছিল।
২৮তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে মেধা কোটায় ৯০ এবং প্রাধিকার কোটায় ১০০ জন, পুলিশে মেধায় ৯০ এবং কোটায় ৯৯ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। ২৯, ৩০, ৩১, ৩৩ প্রতিটি বিসিএসেই এভাবে ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে ৩৪তম বিসিএসের ফলে কোনো ক্যাডারের ক্ষেত্রেই মেধা ও কোটা আলাদা করা হয়নি। এতে মেধায় কতজন ও কোটায় কতজন, ফল দেখে তা বোঝার উপায় নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিএসসির একজন কর্মকর্তা গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকাশিত ফলে সেটি উল্লেখ না থাকলেও পিএসসির কাছে এ বিষয়ে তথ্য আছে। যখন জনপ্রশাসনে তাঁদের নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করা হবে, সেখানে সেটি উল্লেখ থাকবে।’ উল্লেখ না করার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ২৭তম বিসিএস থেকে এ নিয়ম চালু হয়েছিল। কিন্তু কোটার অনেক প্রার্থী বলেছেন, ফলে মেধা ও কোটা আলাদা করা থাকলে তা তাঁদের জন্য অসম্মানের। এ বিষয়টি বিবেচনা করেই এটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ২৭তম বিসিএসের আগেও এভাবে ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
মেধা ও কোটা আলাদা করার পাশাপাশি ২৭তম বিসিএস থেকে প্রতিটি বিসিএসেই কোটার কতটি পদ খালি ছিল, সেটিও উল্লেখ করা ছিল ফলাফলে। ২৮তম বিসিএসে উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় ৬২৮, নারী ৪৫টি, উপজাতির ১৪০টিসহ মোট ৮১৩টি পদ খালি রাখা হয়েছিল। ২৯তম বিসিএসে কোটার ৭৯২টি, ৩০তম বিসিএসে ৭৮৪টি এবং ৩১তম বিসিএসে ৭৭৩টি পদ খালি রাখা হয়েছিল। এমনকি ৩২তম বিশেষ বিসিএসে ১ হাজার ১২৫টি পদ শূন্য রাখার তথ্যও উল্লেখ ছিল। এবার এগুলো উল্লেখ করা হয়নি।
মেধা ও কোটা আলাদা না করে ফল প্রকাশের বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে যেভাবে মেধা ও কোটা নির্ধারণ করা হতো, এবারও সেভাবে হয়েছে। কোনো পার্থক্য করা হয়নি। তবে দ্রুততার জন্যই মেধা ও কোটা আলাদা না করে এভাবে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ, নানা ঝামেলায় এই বিসিএসের ফল দিতে দেরি হচ্ছিল।’
২ হাজার ৫২টি পদে নিয়োগের জন্য ২০১৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ৩৪তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। ওই বছরের ২৪ মে অনুষ্ঠিত প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ১ লাখ ৯৫ হাজার প্রার্থী অংশ নেন। ওই বছরের ৮ জুলাই ফল প্রকাশ করা হয়, ১২ হাজার ৩৩ জন উত্তীর্ণ হন। ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, অনেকে ভালো পরীক্ষা দিয়েও উত্তীর্ণ হননি। অন্যদিকে তাঁদের চেয়ে কম নম্বর পেয়েও অনেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন। পরে জানা যায়, প্রাথমিক বাছাই (প্রিলিমিনারি) থেকেই কোটা পদ্ধতি চালু করায় এমন হয়েছে।
এ নিয়ে আন্দোলনের মুখে ১৪ জুলাই প্রচলিত পদ্ধতিতে সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ৪৬ হাজার ২৫০ জন উত্তীর্ণ হন। এবার বাদ পড়েন ২৮০ জন উপজাতি। তাঁরা আদালতে যান। আদালতের নির্দেশে তাঁদেরসহ পুনরায় ফল প্রকাশ করে গত বছরের মার্চে লিখিত পরীক্ষা হয়। এতে ৯ হাজার ৯৬৩ জন উত্তীর্ণ হন। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি থেকে ১ জুন পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা হয়। সব মিলিয়ে এই বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করতে প্রায় আড়াই বছর লাগল। চূড়ান্ত ফলে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের এখন স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশি যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।



