আড়াই হাজার এনজিওর হাল ধরে আছে বেহাল এনজিও ব্যুরো!
শরিফুল হাসান
বিদেশি অর্থে পরিচালিত দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়াসহ নানা অভিযোগ আছে। আছে যেনতেনভাবে অর্থ-খরচ ও প্রকল্প শেষ করার অভিযোগও। এসব বিষয় তদারকির জন্য সরকারের একমাত্র প্রতিষ্ঠান এনজিওবিষয়ক ব্যুরো। কিন্তু তাদের তত্ত্বাবধান, নজরদারি, নিরীক্ষা নিয়েও আছে নানা অভিযোগ। ফলে পুরো এনজিও খাতের স্বচ্ছতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। কীভাবে চলছে এনজিওবিষয়ক ব্যুরো—দেখতে গত সোমবার বেলা ১১টায় সেগুনবাগিচায় অবস্থিত মত্স্য ভবনের নবম তলায় গিয়ে দেখা যায় এক বিবর্ণ চিত্র। ঢুকতেই বারান্দাজুড়ে কয়েক হাজার ফাইলের স্তূপ। কাছে গিয়ে দেখা গেল, কোনো ফাইলের গায়ে লেখা—বার্ষিক প্রতিবেদন, প্রকল্প ও খরচের হিসাব ইত্যাদি। বাইরে এত কাগজপত্র কেন জানতে চাইলে এক কর্মচারী জানালেন, ‘ভেতরে গিয়ে দেখুন, তাহলে বুঝবেন!’নিবন্ধন শাখার এক কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে দেখা গেল, সব টেবিলে গাদা গাদা ফাইল। এই তলার নয়টি কক্ষেই একই চিত্র। শুধু ফাইলই যে গাদাগাদি অবস্থায় আছে তা নয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বসছেন গাদাগাদি করে। একেকটি কক্ষে চার-পাঁচজন কর্মকর্তা কাজ করছেন। দরজার ওপরে তাঁদের নামফলকেরও গাদাগাদি। কর্মচারীদের কক্ষেরও বেহাল দশা। এক কক্ষে সাত-আটটি টেবিল। যে যাঁর মতো কাজ করছেন। একই কক্ষের মাঝখানে বেড়া দিয়ে ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার বসার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এরই মধ্যে এল বিদেশিদের কয়েকটি প্রতিনিধিদল। তারা কয়েকজন কর্মকর্তার কক্ষে গেল, বৈঠক করলেন এই পরিবেশেই।ব্যুরোর এই দুরবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, এনজিওগুলোর নিবন্ধন, নবায়ন, প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থ ছাড়, বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিবরণ পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, হিসাব নিরীক্ষা—সব কাজ করতে হয় ব্যুরোকে। কিন্তু মাত্র ৬৭ জন লোক নিয়ে ব্যুরোর পক্ষে প্রায় আড়াই হাজার এনজিওর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা অসম্ভব। জনবল নিয়োগ হচ্ছে না কেন—জানতে চাইলে মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ভাড়া করা ভবনে কাজ চলছে। একেকটি কক্ষে তিন-চারজন কর্মকর্তা বসেন। নতুন নিয়োগ দিলে তাঁরা কোথায় বসবেন? মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, নবম তলায় নয়টি এবং দশম তলার তিনটি কক্ষ নিয়ে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর দপ্তর।ব্যুরোর কর্মকর্তারা বলছেন, জনবলের অভাব, পরিবহনসংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে কী কাজ হচ্ছে, কীভাবে এনজিওগুলো টাকা খরচ করছে—এসব দেখার সুযোগ সেভাবে নেই ব্যুরোতে। একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, জনবলসংকট এতই প্রকট যে, অফিস সহকারী থেকে শুরু করে সবাই সব কাজ করছেন। এতে এনজিওগুলোর দুর্নীতি দেখার বদলে ব্যুরোতেই সৃষ্টি হচ্ছে দুর্নীতির সুযোগ। সময় বাঁচাতে এনজিওগুলো যেকোনো মূল্যে তাদের কাজ করিয়ে নিতে চায়। ফলে দুর্নীতি ঢুকে পড়ছে।বৈদেশিক সহায়তায় নেওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন এবং এর সঙ্গে জড়িত বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ১৯ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এনজিওবিষয়ক ব্যুরো। সে সময় এনজিওর সংখ্যা ছিল ৩৮২। জনবলকাঠামো ছিল ৬৭ জনের। ১৯ বছর পর বর্তমানে ব্যুরোতে নিবন্ধিত সারা দেশে এনজিওর সংখ্যা দুই হাজার ৫১৭টি। কিন্তু ব্যুরোতে এখনো সেই ৬৭টি পদই আছে। এর মধ্যে পাঁচটি পদ শূন্য।ফেডারেশন অব এনজিওস ইন বাংলাদেশের (এফএনবি) পরিচালক তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এক জায়গায় যেন একসঙ্গে সব সেবা পাওয়া যায় এবং কাজে যেন স্বচ্ছতা থাকে, সে জন্য এনজিওগুলোর অনুরোধে ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু নানা সমস্যায় ব্যুরো আশানুরূপ কাজ করতে পারছে না, দীর্ঘসূত্রতা বাড়ছে। এতে এনজিওগুলোকেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।এনজিওবিষয়ক ব্যুরো কাজ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে। ব্যুরোর কাজ শুধু বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলোকে নিয়ে। ২০০৭ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনজিওবিষয়ক ব্যুরো দুর্বল। দিন দিন এনজিও বাড়ছে, অথচ ব্যুরোর জনবল মাত্র ৬০। এদের পক্ষে বেশির ভাগ এনজিওর সার্বিক কার্যক্রম দেখা সম্ভব হয় না। গত দুই বছরে এই অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। একই সমস্যা বয়ে বেড়াচ্ছে ব্যুরো। ব্যুরোর অধীন এনজিওগুলোর প্রকল্প দেখার জন্য দুজন পরিচালক ছিলেন। তাঁদের একজন ফজলে এলাহী সম্প্রতি অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে (এলপিআর) গেছেন। অন্য পরিচালককেই এখন সব দেখতে হচ্ছে। ব্যুরোর পরিচালক (প্রকল্প) সুবীর কিশোর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, চাপ তো আছেই। ব্যুরোর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্প্রতি ব্যুরোর অভ্যর্থনার দায়িত্বে নিয়োজিত একজনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বদলি করা হয়েছে। আর অভ্যর্থনার কাজ করছেন একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী।নিরীক্ষা শাখায় দুজন: বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অনেক পুরোনো। এদের আর্থিক বিষয় দেখার জন্য ব্যুরোতে একজন উপ-পরিচালকসহ তিনজন কর্মকর্তা ছিলেন। সম্প্রতি একজন মারা গেছেন। ২০০৭ সালে টিআইবির গবেষণায় বলা হয়, ৯৫ শতাংশ এনজিও আর্থিক ও নিরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্যে ব্যাপক গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করে। ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, হিসাব-নিকাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্বাধীন নন এবং নিরীক্ষা ও আর্থিক প্রতিবেদনে প্রায়ই অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়া হয়। ৯০ শতাংশ এনজিও পরিচিতদের মধ্য থেকে নিরীক্ষক নিয়োগ করে।নিয়ম অনুযায়ী, ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন রুলস, ১৯৭৮-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, বিদেশি অনুদান ও সাহায্যপুষ্ট এনজিওর প্রকল্পগুলো এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরীক্ষা করতে হয়।ব্যুরোর একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বছরের পর বছর ধরে একই নিরীক্ষকেরা একই প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা করে আসছেন। এতে অনেক দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢাকা পড়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা জরুরি।তবে উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, এনজিওর বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ নিরীক্ষা করার জন্য প্রতিবছরই ব্যুরো আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের নাম চায়। এরপর একটি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেলে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাদ দেওয়া হয়।টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, এনজিওগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে হলে ব্যুরোকে সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। ব্যুরোকে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের কাজ দেখতে হবে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ থেকে যেসব টাকা আসছে, কীভাবে সেই টাকা খরচ হচ্ছে, সেটি দেখা। কিন্তু ব্যুরোর সেই জনবল বা যোগ্যতা নেই যে তারা নিরীক্ষা করবে। এর বদলে তারা অন্য কোম্পানির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সত্যিকারের স্বচ্ছতা চাইলে তাদেরও নিরীক্ষার বিষয়টি বুঝতে হবে। মাঠপর্যায়ের কাজ দেখারও সুযোগ নেই: ২০০৮-০৯ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী ঢাকায় এক হাজার ৪২০টি, বরিশালে ৯২টি, চট্টগ্রামে ২০৯টি, খুলনায় ২৪৮টি, রাজশাহীতে ৩১৮টি ও সিলেটে ৫৩টি বিদেশি অর্থে পরিচালিত এনজিও কাজ করছে। ১৯৯০ থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত এ এনজিওগুলোর বিপরীতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। এই সময় মোট প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ১৪ হাজার ৬২১টি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এনজিওগুলো কীভাবে কাজ করছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যুরোর পক্ষে তা দেখা সম্ভব হয় না। ২০০১ সালের ২৯ মে সরকারি এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বেসরকারি সংস্থাগুলোর যেকোনো কর্মকাণ্ড দেখতে যেতে পারবেন এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর কর্মকর্তারা। কিন্তু লোকবলের অভাবে সেটি করা সম্ভব হয় না। ফলে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের কাজ দেখার জন্য সরকার অনুরোধ জানিয়েছে।ব্যুরোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসক এবং ইউএনওরা তাঁদের প্রশাসনিক কাজ শেষ করে এনজিও দেখার সময় সেভাবে পান না। ফলে মাঠপর্যায়ে এনজিওগুলো কী করছে, সেটা দেখা সম্ভব হয় না। পরিবহনসমস্যা প্রকট: ব্যুরোতে কেবল মহাপরিচালকের সরকারি গাড়ি আছে। বাকি সবার জন্য আছে একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাস। একজন কর্মকর্তা বলেন, কোনো এনজিওর কাজ পরিদর্শন করতে হলে গাড়ির অভাবে অনেক সময় বাধ্য হয়ে ওই এনজিওর গাড়িতে যেতে হয়। ফলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। অনেক অন্যায় হজম করে আসতে হয়। নতুন ভবন হচ্ছে না: ১৯ বছর ধরে ভাড়া করা ভবনে ব্যুরোর কাজ চলছে। আগারগাঁওয়ে ব্যুরোর ভবন তৈরির জন্য জায়গা পাওয়া গেছে। ভবনের নকশাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, নতুন ভবন তৈরি হলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।



