শরিফুল হাসান

রাত পোহালেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গাইবান্ধা জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতেই ভোট গ্রহণ হবে। সাম্প্রতিক সময়ে এই জেলায় জামায়াত-শিবির তাণ্ডব চালিয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের নির্বাচন প্রতিহতের আহ্বান এবং অবরোধ-হরতালের মধ্যেই এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
ফলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। তাই ভোট চাওয়ার চেয়েও প্রার্থীরা এবং আওয়ামী লীগের নেতারা ভোটারদের বেশি উদ্বুদ্ধ করেছেন ভোটকেন্দ্রে যেতে। ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের মধ্যেও রয়েছে আতঙ্ক। এসব কারণে পুলিশ ও প্রশাসনও নিরাপত্তা জোরদার করার কথা বলছে।
গাইবান্ধায় মোট সংসদীয় আসন পাঁচটি। এর মধ্যে গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ফজলে রাব্বী মিয়া। তাই আগামীকাল রোববার গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ), গাইবান্ধা-২ (সদর), গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী) ও গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে। এসব আসনে প্রার্থী ১২ জন। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জ ও পলাশবাড়ীতে ভোটার এবং ভোট কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি। কারণ, গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে এই দুই উপজেলায় জামায়াত-শিবিরের সহিংসতায় সাতজন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন।
জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই চারটি আসনে মোট ভোটার ১৩ লাখ ২১ হাজার ২৭৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ছয় লাখ ৪২ হাজার ৬০২ জন ও নারী ছয় লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৪ জন। মোট ৪৬৫টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে। এগুলোর ২৬২টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে গোবিন্দগঞ্জে ১০৯টি মধ্যে ৬৭টি, পলাশবাড়ীতে ৬৩টির মধ্যে ৫২টি, সুন্দরগঞ্জে ১০৯টির মধ্যে ৬০টি ও সাদুল্যাপুরে ৬৭টির মধ্যে ৩৭টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
গাইবান্ধার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক জহুরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুন্দরগঞ্জ ও পলাশবাড়ীসহ এই জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ২৬২টি কেন্দ্রেই নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা হয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ—সবাই নির্বাচনের দায়িত্বে থাকবে। আশা করছি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে।’
গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন বর্তমান সাংসদ মাহবুব আরা বেগম। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মকদুবর রহমানের প্রতীক আনারস। গত কয়েক দিন ব্যাপক গণসংযোগ করা এ দুই প্রার্থীই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তবে নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের খুব বেশি আগ্রহ নেই। পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কে থাকা ভোটাররা চিন্তা করছেন, ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি না। গতকাল সদর উপজেলার খোলাহাটি গ্রামের রিকশাচালক হারুন মিয়া আলাপকালে বলেন, ‘সোরকারি দলের নোকেরা ভোট দিব্যার যাবার কয়, বিরোধী দলের নোকেরা কয় ভোট দিব্যার যান না, গন্ডগোল হবি। হামরা একন কি করমো। যামো কি না চিন্তাত আচি।’ শঙ্কার কথা জানান আরও কয়েকজন ভোটার।
ভোট গ্রহণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও শঙ্কিত। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পাওয়া গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোডের কলেজশিক্ষক অশোক সাহা বলেন, ‘সরকার আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে। পালন তো করতেই হবে। তার পরও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মনে একটু একটু ভয় তো কাজ করবেই।’
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে প্রার্থী পাঁচজন। বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে লাঙ্গল প্রতীকে এবারও অংশ নেওয়া বর্তমান সাংসদ আবদুল কাদের খানের সঙ্গে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনজুরুল ইসলামের। তাঁর স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্বতন্ত্র প্রার্থী। অন্য দুই প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির (জেপি) রেজিয়া খাতুন এবং সোহেল রানা।
জেলায় সুন্দরগঞ্জের ভোটাররাই বেশি আতঙ্কে আছেন। সুন্দরগঞ্জের ঢোপাডাঙ্গা গ্রামের ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ আসনে জামায়াত-শিবিরের অনেক দাপট। তারা ভোটের দিন গন্ডগোল করতে পারে। তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করায় ভয়ে আছি। কী করব, বুঝতে পারছি না।’
গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী) আসনে তিনজন প্রার্থী। নৌকা প্রতীক নিয়ে এখানে নির্বাচন করছেন ইউনুস আলী। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের ঘনিষ্ঠ ও ছয়বারের সাংসদ টি আই এম ফজলে রাব্বী চৌধুরী এবার নির্বাচন করছেন না। অপর দুই প্রার্থী হলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের খাদেমুল ইসলাম এবং জেপির ফজলে করিম।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই পলাশবাড়ীতে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব চলছে। জামায়াতের নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকরের রাতে এখানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ আওয়ামী লীগের ১৫ জন নেতা-কর্মীর বাড়িঘর ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইউনুসের গাড়িবহরে হামলা হয়। গতকাল হামলা হয় পুলিশের ওপর। এতে ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন। ফলে ভোটের দিনের পরিস্থিতি নিয়ে কেবল সাধারণ ভোটার নয়, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও আতঙ্কে আছেন।
সাদুল্যাপুরের রসুলপুর গ্রামের কলেজশিক্ষক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘পরিস্থিতি ভালো থাকলে ভোট দেব, খারাপ হলে দেব না।’
পলাশবাড়ী সদরের কালির বাজারের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মনজুর কাদির বলেন, জেলার অন্য কোথাও না হলেও পলাশবাড়ীতে সহিংসতা হতে পারে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে পলাশবাড়ীতে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের কারণে ভোটাররা আতঙ্কে আছেন।
গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীর মধ্যে। দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সাংসদ মনোয়ার হোসেন চৌধুরী। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ।
গোবিন্দগঞ্জের কাটা গ্রামের কৃষক আবুল কাশেম বলেন, দুই প্রার্থীই আওয়ামী লীগের হওয়ায় বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা কম। তাই তাঁরা ভোট দিতে যাবেন।
জেলায় সেনা টহল শুরুর পর ১৮ দল নির্বাচন প্রতিহতের কথা সরাসরি না বলে নির্বাচন বর্জনের জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাউসুল আজম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষকে ভোট দিতে না যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ৯০ শতাংশ ভোটারই কেন্দ্রে যাবেন না। এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।’
তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘প্রার্থীরা উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সভা, সমাবেশ ও নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ রয়েছে। আমরাও ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে বলেছি। বিরোধী দল অংশ না নিলেও সাধারণ মানুষ ঠিকই ভোট দিতে আসবেন।’
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার সাজিদ হোসেন বলেন, ‘ভোটের দিন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে সব জায়গায় অতিরিক্ত পুলিশ থাকবে। র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী টহল দেবে। কারও ভয়ের কারণ নেই। আমরা আশা করছি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে।’



