শরিফুল হাসান
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ (রিজার্ভ) ৭০ হাজার কোটি টাকা বা এক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে রিজার্ভের এই রেকর্ড উদ্যাপনকালে গভর্নর আতিউর রহমান বলেছিলেন, রিজার্ভের এই অর্জনের মূল কৃতিত্ব প্রবাসীদের।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ৬৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত। তাঁরাই দেশের রিজার্ভের রেকর্ড গড়তে, অর্থনীতিকে বিপদমুক্ত রাখতে সহায়তা করছেন। গত নভেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) এসেছে ৬৭ হাজার ৯৭১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বিপরীতে অভিবাসী এই কর্মীরা মর্যাদার বদলে পাচ্ছেন বহুমুখী অবহেলা, আর দেশে-বিদেশে শিকার হচ্ছেন উন্মুক্ত প্রতারণার।এ অবস্থায় সারা বিশ্বের মতো আজ বাংলাদেশেও পালিত হবে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘অভিবাসীর অধিকার: নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার’। এতেই বোঝা যায়, দেশে দেশে প্রবাসী কর্মীরা নিরাপত্তাঝুঁকিতে আছেন, বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায়বিচার থেকেও।বিদেশফেরত ও বিদেশে যাওয়ার আশা নিয়ে যাঁরা বিভিন্ন দপ্তরে ছুটে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের কয়েকজন জানান, পাসপোর্ট তৈরি থেকেই হয়রানির শিকার হওয়া শুরু। এরপর রিক্রুটিং এজেন্সির দালাল ও প্রতারক এজেন্সি, চাকরির বিষয়ে অসত্য তথ্য, উচ্চমূল্যে ভিসা কেনাবেচা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সরকারি ছাড়পত্র—সব ক্ষেত্রে সীমাহীন ভোগান্তি। দেশের আকাশ পার হলে শুরু হয় বিরূপ প্রকৃতি, অমানুষিক পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন, মালিকদের প্রতারণা, নির্যাতনসহ আরও কত কি। সে জন্যই এবারের অভিবাসী দিবসে তাঁদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।প্রবাসী কর্মীরা নিজেদের নিরাপত্তা আর অধিকার নিশ্চিত করতে সাধারণত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর দ্বারস্থ হন। তাঁদের অভিযোগ, সেখানে তাঁদের পরিচয় কেবলই শ্রমিক। সেবার বদলে অবহেলা তাঁদের মানসিক শক্তিও নষ্ট করে দেয়।সম্প্রতি বিদেশে কর্মী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে গেছে। বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে হচ্ছে ছাঁটাইও। গত ১১ মাসে ফিরে এসেছেন ৬৮ হাজার ৫৫ কর্মী। এ সময়ে দুই হাজার ১২১ জনের লাশ এসেছে দেশে। বিভিন্ন দেশের কারাগারে আছেন প্রায় ছয় হাজার কর্মী।বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতি গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় এই খাতে সরকারের কোনো বিনিয়োগ নেই। কর্মীদের শুধু টাকা পাঠানোর যন্ত্র ভাবলে চলবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইলিয়াছ আহমেদ বলেন, এটি সত্য যে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিদেশে প্রবাসীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। তবে বর্তমান সরকার প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে।জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটির) মহাপরিচালক খোরশেদ আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিএমইটিসহ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে।২০০৭ সালে আট লাখ ৩২ হাজার ৬০৯ এবং ২০০৮ সালে আট লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এই দুই বছরে বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে যথাক্রমে ৪৫ হাজার ৭২৪ কোটি ৪৪ লাখ এবং ৬২ হাজার ২১০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আর এ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে ৬৭ হাজার ৯৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা।১০ ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন চার লাখ ৫১ হাজার ৫৭১ কর্মী। বিশ্বমন্দার কারণে এবার জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। তবে সবচেয়ে বেশি দুই লাখ ৪৪ হাজার ৩৪৮ কর্মী গেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে।ফেরত আসা ৬৮ হাজারের পাশে কেউ নেই: মন্দাসহ নানা কারণে এবার বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত এসেছেন ৬৮ হাজার ৫৫ কর্মী। এর মধ্যে ৬৬ হাজার ৮৫৪ জনকেই আকস্মিক (আউট পাস দিয়ে) পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বছর সবচেয়ে বেশি ২৫ হাজার ৬৮৯ জন কর্মী ফেরত এসেছেন সৌদি আরব থেকে।মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আসা জয়নাল আবেদিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মতো যাঁরা বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার জন্য এখন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন। তাঁদের দেখার কেউ নেই।গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু খাত আছে যারা বেতন-বোনাসের জন্যও সরকারের কাছে প্রণোদনা চায়। কিন্তু আমরা মন্দার কারণে ফেরত আসা লোকদের জন্য সরকারের কাছে ৫০০ কোটি টাকা চেয়েছিলাম। বলেছিলাম, সরকার সরাসরি এই টাকা দিক; কিন্তু সেটি করা হয়নি।’লাশ এসেছে দুই হাজার ১২১: সরকারি হিসাবে এ বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে দুই হাজার ১২১ জনের লাশ এসেছে। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, এই সংখ্যা তিন হাজারের মতো।বিএমইটির কল্যাণ ডেস্কের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) জিয়াউল হক জানান, নভেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে ৬৭৮ জন, মালয়েশিয়া থেকে ৪২৫, কুয়েত থেকে ১২৯, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৩৫৫ জনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দুই হাজার ১২১ জনের লাশ এসেছে।বিএমইটির কল্যাণ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কাগজপত্রে এসব কর্মীর বেশির ভাগেরই মৃত্যুর কারণ হিসেবে হূদরোগ, সড়ক দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ইত্যাদি উল্লেখ থাকে।তবে অনেক প্রবাসীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, নির্যাতনের কারণেই মারা গেছেন তাঁদের স্বজনেরা। তাঁদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে লাশ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আর ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ক্ষয়ে যায় আরও অনেক অর্থ ও সময়।মালয়েশিয়ায় নিহত ইকতিয়ারের পরিবার জানায়, দেড় মাস আগে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন ইকতিয়ার। কিন্তু পাসপোর্ট, ভিসা ও চাকরি না থাকার কারণে সেখানে তাঁকে গুদামে থাকতে হয়। হঠাত্ অভিবাসন পুলিশ তাঁকে ধরে জেলখানায় নিয়ে যায় এবং চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। জেলখানায়ই মৃত্যু হয় ইকতিয়ারের।ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ভোগান্তি: প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীদের বেশির ভাগ পরিবার সরকার-নির্ধারিত দাফন ও মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের টাকা পায় না। প্রবাসীদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি সহায়তা ডেস্ক থাকলেও লাশ বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তারা প্রায় সময়ই সহায়তা দেয় না।টাঙ্গাইলের দরিদ্র পান ব্যবসায়ী মহেশ সংসারের অভাব ঘোচাতে নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ায় যান, কিন্তু প্রত্যাশিত কাজ পাননি। মহেশের স্ত্রী ঝর্ণা সরকার প্রথম আলোকে জানান, যাওয়ার কিছুদিন পর থেকেই তিনি ফোনে দুর্ভোগের কথা জানাতে থাকেন। সেখানে নির্জন এলাকায় একটি ঘরে তাঁকে আটকে রাখা হয়। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। প্রতিবাদ করলেই নির্যাতন করা হতো। তাঁর স্বামী আট মাস ধরে অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে অসুস্থ হয়ে ২০০৭ সালের ৬ অক্টোবর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের আশ্রয়কেন্দ্রে মারা যান। ওই বছরের ১০ অক্টোবর মহেশের মরদেহ দেশে আনা হয়। কিন্তু তাঁর পরিবার আজও ক্ষতিপূরণের কোনো টাকা পায়নি। দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে ঝর্ণা চোখে অন্ধকার দেখছেন।বিএমইটির মহাপরিচালক খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, এখন ক্ষতিপূরণের টাকা এক লাখ থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ করা হয়েছে। এই টাকা পেতে যেন ভোগান্তি না হয়, সে বিষয়টি তাঁরা দেখবেন।সহায়তা মেলে না দূতাবাসে: সৌদি আরবে কর্মরত কুমিল্লার রকিবুল ইসলাম, কুয়েতে কর্মরত আবদুর রহমান, মালয়েশিয়ায় কর্মরত জুয়েল রানাসহ কয়েকজন বাংলাদেশি প্রথম আলোকে জানান, দূতাবাস থেকে তাঁরা কখনোই সেবা পান না।প্রবাসী শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হেদায়েত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিদেশ থেকে আসা যত শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছেন, সবার প্রথম অভিযোগ, দূতাবাস থেকে তাঁরা সহায়তা পান না; বরং দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।বিএমইটির মহাপরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, দূতাবাসগুলোতে লোকবল আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, যাতে তাঁরা প্রবাসীদের আরও বেশি সেবা দিতে পারেন।সরকারের কিছু উদ্যোগ: খোরশেদ আলম চৌধুরী আরও জানান, সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক চাহিদার নিরিখে আরও ৩০টি নতুন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পাঁচটি মেরিন টেকনোলজি ও প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক স্থাপন করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতারণা রোধ ও বিদেশগামী কর্মীদের সঠিক পরিসংখ্যান রাখার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহায়তায় একটি তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা হবে। কয়েক বছরের মধ্যেই প্রবাসীরা এর সুফল পাবেন।শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, প্রবাসী কর্মীরা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁদের ওপর নির্যাতন বন্ধে তাঁরা বিদেশে যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে যাচ্ছেন, সেগুলোর ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া উচিত। শ্রমিকদের ইনস্যুরেন্স, স্বাস্থ্যবিমাসহ অন্য বিষয়গুলোর ব্যাপারে এখন যত্নবান হতে হবে।ঘোষণায় আছে, বাস্তবে নেই: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বলা আছে, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বিমানবন্দরে কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। ফেরার ক্ষেত্রে কোনো রকমের ভোগান্তি যেন না হয়, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিবছর প্রবাসীদের মধ্য থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোকে মানদণ্ড ধরে বিভিন্ন ক্যাটাগরি ঘোষণা, সব বিষয়ে তাদের অগ্রাধিকার, এমনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ করার কথা। এর সবই আছে কাগজে-কলমে। বাস্তবে হয় না কিছুই। সৌদি আরব প্রবাসী প্রকৌশলী ফকরুল বাশার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারত ও ফিলিপাইনের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, দেশের বিমানবন্দরে তাঁদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। ভারতে এনআরআইদের (নন-রেসিডেন্ট ইন্ডিয়ান—অনাবাসী ভারতীয়) রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা দেওয়া হয়। অথচ আমাদের বিমানবন্দরের ব্যবহার দেখলে মনে হয়, আমরা মানুষই না।’প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০০৬ ও ২০০৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা আছে, প্রবাসীদের হয়রানি থেকে রক্ষা এবং বৈদেশিক চাকরির ক্ষেত্রে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রবাসীকল্যাণ শাখা নামে নতুন একটি শাখা খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এরও বাস্তবায়ন হয়নি।



