শরিফুল হাসান
বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করার চিন্তা করছেন জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ) সদস্যরা। আজ বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে তাঁরা এ সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন।বায়রার কয়েকজন নেতা জানান, গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বেও জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রী, সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নেতিবাচক মন্তব্যের প্রতিবাদে বায়রা এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। বুধবার সংবাদ সম্মেলনে একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়ে জনশক্তি রপ্তানি সাময়িক বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হবে। ওই সময়সীমার মধ্যে সরকার অবস্থান না বদলালে তাঁরা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) লোক পাঠানোর জন্য আর ছাড়পত্র নিতে যাবেন না। এর পরও সমস্যার সমাধান না হলে তাঁরা লাইসেন্স প্রত্যাহারের বিষয়টিও ভাবছেন।তবে বিভিন্ন সূত্র জানায়, এসব মন্তব্যের পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানিকারকদের বাদ দিয়ে সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর উদ্যোগেও বায়রার সদস্যরা ক্ষুব্ধ।জানতে চাইলে বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, জনশক্তি রপ্তানি এখন বিশাল খাত। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স মোট জাতীয় প্রবৃদ্ধির ১২ শতাংশ। এই সাফল্যের পেছনে মূল অবদান এ খাতের ব্যবসায়ীদের। কারণ, ১৯৭৬ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মোট ৮১ লাখ ৮১ হাজার ২৭৪ জন কর্মী বিভিন্ন দেশে গেছেন। এর মধ্যে সরকারিভাবে হয়তো ৫০ হাজার লোক বিদেশে গেছেন। বাকি ৮১ লাখেরও বেশি লোক বিদেশে গেছেন সরাসরি বায়রার সদস্যদের মাধ্যমে।আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘এই বিরাট অবদান রাখা সত্ত্বেও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী জনশক্তি রপ্তানিকারকদের দালাল, রক্তচোষা, প্রতারকসহ যা-তা বলছেন। আমরা মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ ধরনের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি করছি। আর বায়রার সদস্যদের বাদ দিয়ে এই খাতের কোনো কার্যক্রম চলতে পারে না। তাই আমরা সাময়িকভাবে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছি। প্রাথমিকভাবে আমরা বায়রার কোনো সদস্য লোক পাঠাব না। এর পরও সমস্যার সমাধান না হলে প্রয়োজনে আমাদের ব্যবসা করার সনদ সরকারের কাছে জমা দিয়ে দেব।’প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান বলেন, ‘মালয়েশিয়ার বাজারে বায়রার ভূমিকা কী, তা সবাই জানেন। তাঁদের নানা অনিয়মের কারণে ২০০৯ সালে এই বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাজারটি আবার চালুর চেষ্টা করছে। মালয়েশিয়া সরকারও বলছে, তারা অনিয়ম দূর করতে সরকারিভাবে লোক নিতে চায়। এ ক্ষেত্রে সরকার কোনো অন্যায় আবদারের কাছে মাথা নত করবে না।’এদিকে অভিবাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টি দেখভাল করতে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। আর সরাসরি লোক পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বায়রার সদস্যরা। এ ক্ষেত্রে উভয়ে পরস্পরের পরিপূরক। কাজেই পরস্পরবিরোধী অবস্থানে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।যেভাবে দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব: বায়রার সদস্যরা জানান, ২০০৮ সালে কুয়েত এবং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েন জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা। সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া হয়নি। মন্ত্রী এসব বাজার বন্ধের জন্য বায়রার সদস্যদের কর্মকাণ্ডকেই দায়ী করেন। এ অবস্থায় ২০১১ সালের শুরুতে রাজধানীর একটি হোটেলে বায়রার সাধারণ সম্মেলনে সদস্যরা মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। তবে বায়রার নেতারা সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলেন। কিন্তু সম্প্রতি সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং মন্ত্রীর বক্তব্যে জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা ক্ষুব্ধ হন। ঈদের পর বায়রার সাধারণ সভায় সদস্যরা মন্ত্রী, সচিবের কঠোর সমালোচনা করেন এবং আন্দোলনের দাবি জানান। এসব বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ৬ সেপ্টেম্বর প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে বায়রাকে সতর্ক করে একটি চিঠি দেওয়া হয়।চিঠিতে বলা হয়, গণমাধ্যমে অসত্য, ভিত্তিহীন ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বায়রা। এতে আরও বলা হয়, ‘বায়রা রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান। বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সার্বিক শৃঙ্খলা আনয়ন ও প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বায়রা দায়বদ্ধ থাকলেও এ যাবৎ তার কোনো প্রতিফলন দৃশ্যমান হয়নি।’ সাত দিনের মধ্যে এসব ব্যাপারে বায়রার জবাব চাওয়া হয়।বায়রা সূত্র জানায়, এমন চিঠিতে বায়রার সদস্যদের ক্ষোভ বাড়ে। নির্ধারিত সময়ের আগেই ১১ সেপ্টেম্বর চিঠির জবাব দেয় বায়রা। ছয় পৃষ্ঠার ওই জবাবে বিভিন্ন সরকারি গেজেট ও প্রজ্ঞাপনের সূত্র উল্লেখ করে বায়রার ভূমিকা তুলে ধরা হয়।মন্ত্রণালয় ও বায়রা সূত্র জানায়, ১১ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী বাংলাদেশে আসেন। এই সফরের আগে বায়রার সদস্যরা প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তিনবার সময় চান। মন্ত্রী সাক্ষাতে রাজি না হওয়ায় বায়রার সদস্যরা ক্ষুব্ধ হন। সর্বশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর সফর ও শ্রমবাজার নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আবারও বায়রার সদস্যদের কঠোর সমালোচনা করেন এবং বায়রার সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনেন। সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনারও বায়রার সদস্যদের ভূমিকার সমালোচনা করেন।বায়রা সূত্র জানায়, এমন বক্তব্যে ক্ষুব্ধ বায়রার সদস্যরা পরদিন শুক্রবার ও শনিবার ইস্কাটনে বায়রা কার্যালয়ে নেতাদের ঘেরাও করেন। তাঁরা এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের আহ্বান জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে বায়রার কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, মন্ত্রী, সচিব ও হাইকমিশনার তাঁদের বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা সময়সীমা বেঁধে দিয়ে একযোগে জনশক্তি রপ্তানির কার্যক্রম বন্ধ করবেন।বায়রার সহসভাপতি আবুল বারাকাত ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রী-সচিব সবাই বলছেন, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে মালয়েশিয়ায় প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কর্মী গিয়েছিল, আর বায়রা এ অনিয়ম করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হাইকমিশনের সত্যায়ন ছাড়া জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা একজন লোকও পাঠাতে পারেন না। তা হলে হাইকমিশন ও মন্ত্রণালয় কী করল? রিক্রুটিং এজেন্সি কোনো অনিয়ম করলে সরকার তাদের সনদ বাতিল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার কী করল?’সরকারিভাবে লোক পাঠালে সমস্যা কী, এই প্রশ্নে বায়রার সভাপতি শাহজালাল মজুমদার বলেন, ‘মন্ত্রী বলছেন বিমানভাড়া ও অন্য সব ফি নিয়োগকারীরা দেবে। আমাদের প্রশ্ন, সবই যদি তারা দেয় তাহলে ৫০ হাজার টাকা কেন লাগবে? সে ক্ষেত্রে আমরা ২০ হাজার টাকায় লোক পাঠাতে পারব। আর মন্ত্রী যেভাবে সব ব্যবসায়ীকে দালাল বলছেন, তাতে আমাদের এক হাজার ২০০ সদস্যের সবাই ক্ষুব্ধ। আমরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছি। আমাদের বাদ দিয়ে সরকার কেন ব্যবসা করবে? মন্ত্রী যদি তাঁর অবস্থান থেকে সরে না আসেন, তা হলে আমরা কেবল ব্যবসা বন্ধ কিংবা লাইসেন্স প্রত্যাহার নয়, আরও কঠোর কর্মসূচি দেব।’জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সমাজে যে কেউ যেকোনো ধরনের কর্মসূচি দিতে পারে। এ নিয়ে আমরা ভীত নই।’ দালাল-প্রতারক বলে অপমানিত করা হয়েছে—বায়রা সদস্যদের এ অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতারণার ঘটনা তো সেখানে ঘটেছেই। দুই লাখ ৬৭ হাজার অবৈধ লোক সেখানে ছিল। এটা কি প্রতারণা নয়? আর প্রতারককে কী বলা উচিত। তাঁরা যতই কঠোর কর্মসূচি দিন না কেন অবস্থান থেকে সরে আসার সুযোগ আমার নেই।’



