কর্মীকেই লেভি দেওয়ার নিয়ম অনুমোদন

Spread the love

মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা

শরিফুল হাসান

সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় যেতে কর্মীপ্রতি খরচ ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও তা বেশ কিছু বাড়তে পারে। প্রথম দফায় বনায়ন খাতে যেসব কর্মী যাবেন, তাঁদের জনপ্রতি অন্তত ১০ হাজার টাকা বেশি লাগতে পারে।মালয়েশিয়া নিয়োগকর্তার বদলে কর্মীকে লেভি (কর) দেওয়ার নতুন নিয়ম করায় এই খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত বুধবার মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা এই নিয়ম অনুমোদন করেছে।যোগাযোগ করা হলে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কর্মকর্তারা গতকাল বৃহস্পতিবার জানান, নতুন নিয়মটি সম্পর্কে তাঁরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানেন না। তবে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশন বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির কর্মকর্তারা জানান, সরকারিভাবে প্ল্যান্টেশন (বনায়ন) খাতে মালয়েশিয়ায় কর্মী যেতে জনপ্রতি ৪০ হাজার টাকা খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এক পথের বিমানভাড়া ঠিক করা হয়েছে ৩১ হাজার ৫০০ টাকা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা, কল্যাণ ফি ২৫০ টাকা। এ ছাড়া নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের জন্য ৩০০ টাকা, ভিসা ফি এক হাজার ১০০, সার্ভিস চার্জ দুই হাজার, আয়কর ২০০ এবং প্রশিক্ষণবাবদ এক হাজার টাকা নেওয়া হবে। তবে লেভি দিতে হলে এই কর্মীদের খরচ অন্তত ১০ হাজার টাকা বাড়বে। আর উত্পাদন ও সেবাসহ অন্যান্য খাতে যেতে খরচ হবে এর চেয়ে অনেক বেশি।জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরকালে এ বিষয়ে আভাস দিয়েছিল। তারা বলেছিল, যেহেতু ন্যূনতম বেতন অনেক বাড়ানো হয়েছে, তাই নিয়োগকর্তারা লেভি দিতে চাইছেন না। তবে এ নিয়ম হলে সব দেশের জন্যই হবে।’মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম কাউন্সেলর মন্টু কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে যে কোম্পানি লোক নিত, তারাই শ্রমিকের লেভি দিত। কিন্তু সম্প্রতি মালয়েশিয়া শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন অনেক বাড়ানোর পর নিয়োগকর্তারা আর লেভি দিতে চাইছেন না। ফলে এখন থেকে কর্মীকেই লেভি দিতে হতে পারে।’বাংলাদেশি শ্রমিকদের কী পরিমাণ লেভি দিতে হতে পারে—জানতে চাইলে মন্টু কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘মালয়েশিয়া সরকার আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানায়নি। তবে প্ল্যান্টেশন খাতে কর্মীদের প্রতিবছর ৪৫০ রিঙ্গিত (১০ হাজার টাকা) লেভি দিতে হবে। এতে বাংলাদেশি কর্মীদের অভিবাসন খরচ আরও ১০ হাজার টাকা বাড়তে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, সব বিদেশি কর্মীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। তবে শ্রমিক আসার সময় যদি নিয়োগকর্তা টাকাটা দিয়ে দেয় এবং পরে তাদের বেতন থেকে তা সমন্বয় করা যায় কি না, সেটি আমরা দেখছি।’মালয়েশিয়ার ইংরেজি দৈনিক স্টার ও সান-এর অনলাইন সংস্করণের খবরে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা নতুন এই নিয়ম অনুমোদন করেছে। বুধবার দেশটির অর্থমন্ত্রী আহমেদ হোসনি হান্দালজা এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেছেন, নতুন শ্রমিক নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন থেকে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এ ছাড়া পুরোনো যাঁরা কাজের অনুমতি নিতে যাবেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে।দেশটির অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নিয়োগকর্তারা বলছেন ন্যূনতম বেতন বেড়ে যাওয়ায় কর্মীর জন্য লেভি দেওয়ার চাপ তাঁরা নিতে পারবেন না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের নিয়োগকর্তাদের ওপর থেকে চাপ কমাতেই সরকার নতুন নিয়ম করেছে। আর যে লেভি বাড়ানো হয়েছে, তাতে একজন শ্রমিকের গড়ে ৩৪ থেকে ১৫৪ রিঙ্গিত দেওয়া লাগতে পারে। অন্যদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন বেড়েছে মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ রিঙ্গিত।’স্টার-এর অনলাইন সংস্করণের আরেক খবরে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সংগঠন এবং কয়েক শ নিয়োগকর্তা ন্যূনতম বেতন বাড়ানোর প্রতিবাদে এবং লেভি বাতিলের দাবিতে দুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। তাঁরা এই মুহূর্তে কেবল মালয়েশীয় শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবি করেছেন। তাঁরা মানবসম্পদমন্ত্রী সুব্রামনিয়ামের পদত্যাগও দাবি করেন।মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ছয় থেকে সাত লাখ বিদেশি শ্রমিক রয়েছেন। দেশটি ২০০৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘ কূটনৈতিক যোগাযোগের পর দেশটি এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সরকারিভাবে কর্মী নিতে রাজি হয়। গত বছরের ২৬ নভেম্বর এ ব্যাপারে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ ডিসেম্বর মালয়েশিয়া প্রথম দফায় বনায়ন খাতে ১০ হাজার কর্মীর জন্য চাহিদাপত্র পাঠায়।এরপর ১৩ জানুয়ারি থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সারা দেশে বনায়ন খাতে মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের নাম নিবন্ধন চলে। সারা দেশে নিবন্ধন করেন প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ মানুষ। লটারি করে তাঁদের মধ্যে থেকে প্রথম দফায় ৩৬ হাজার ৩৮ জনকে এবং পরে আবার লটারি করে চূড়ান্তভাবে ১১ হাজার ৭৫৮ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। সরকার আশা করছে, সবকিছু ঠিক থাকলে মার্চের শুরু থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী যেতে শুরু করবে।এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রা সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া ঠেকাতে নানা অপতত্পরতা চালাচ্ছে। তবে বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করেছেন। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই সরকার মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল হোক। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সহযোগিতা লাগলে সেটাও আমরা করতে প্রস্তুত। কিন্তু দয়া করে সরকার যেন আমাদের ওপর মিথ্যা কোনো দায় না চাপায়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.