দেশে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার ভয়ঙ্কর এক ক্রেজ চলছে। সারাদেশের লাখো তরুণ সেই ক্রেজে মাতোয়ারা।
আমি বলছি না বিসিএস ক্যাডার হওয়া যাবে না কিন্তু একটা দেশের সবচেয়ে শিক্ষিত তরুণরা যখন শুধু বিসিএসকেই ধ্যান জ্ঞাণ বানিয়ে ফেলতে হবে তখন বুঝতে হবে কোথাও সমস্যা আছে। সেই সমস্যা যেমন অামাদের মানসিকতার তেমনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থারও।
কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন বিসিএস ক্যাডার হতে পারেননি বলেই আপনি এমন কথা বলছেন। তাদের উদ্দেশ্য বলতে চাই আমার জীবনের স্বপ্নই ছিল আমি সাংবাদিকতা করবো। আমি মানুষের জীবনের গল্প বলবো। আমার বর্ণ পরিচয় শুরু হয়েছিল পত্রিকার হেডলাইন পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাষ্টার্স দুটোতেই প্রথম শ্রেণী পেয়েও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করিনি। একইভাবে কখনো বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নও কখনো দেখিনি।
তবে আমি বোধহয় এই মুহুর্তে বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক যে টানা এক দশক ধরে বিসিএস আর পিএসসির কর্মকাণ্ড গভীরভাবে দেখছে খুব কাছ থেকে। অামার চেয়ে বেশি বিসিএসের ছেলেমেয়েদের সাথে অার কেউ কথা বলে কী না সন্দেহ।
২০০৭ থেকে এখন পর্যন্ত যারা পিএসসির চেয়ারম্যান হয়েছেন তাদের সবার সাথে আমার খুব কাছ থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত দুজন আমায় খুব করে অনুরোধ করেছিলেন আমি যেন বিসিএস দেই। আমি তাদের হাসতে হাসতে বলেছিলাম আমিও যদি স্যার বিসিএসে বসে যাই তাহলে আপনাদের সমালোচনা করবো কীভাবে? তারা আর আমাকে ঘাটাননি। আর এটাও সত্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় আমি যে বেতন পেতাম সেটা একজন বিসিএস ক্যাডারের তিনগুন।
২০০২ সালে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি তখনো দেশে এতো বিসিএস ক্রেজ ছিল না যেটা আজ দেখছি। আমাদের সময়ে ছেলেমেয়েরা কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ কেউ বিদেশে উচ্চশিক্ষার, কেউ কেউ দেশি বিদেশি সংস্থা বা ব্যাংকে ভালো চাকুরির স্বপ্ন দেখতো। ২০০৪-০৫ এ যখন দেশের মিডিয়া বুম করছে নতুন নতুন টেলিভিশন আসছে তখন দেখেছি অনেকে আমার মতো সাংবাদিক হতে চাইছে। আমার বন্ধুদের অনেককে আমি রাজনীতিবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেও দেখেছি। কিন্তু আজকে বেশিরভাগ তরুণ মেতে আছে বিসিএস ক্রেজে।
কী ডাক্তার কী ইঞ্জিনিয়ার কী ফিশারিজ কী ফিলোসোফি যে যে বিভাগেরই ছাত্র হোক না কেন প্রথম দ্বিতীয় বর্ষে এসেই বিসিএসের ভুত মাথায় চাপিয়ে নিচ্ছে। গতকালই আমি আমার এক লেখায় বলেছি আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল কিংবা বিজ্ঞান লাইব্রেরীতে যান দেখবেন সারাদিন ছেলেমেয়েরা বিসিএসের লেখাপড়া করছে। চা খেতে মাঝে মধ্যে বাইরে আসা ছাড়া তাদের জীবনে কোন আনন্দ নেই। কিছুদিন আগে আমি আমার একটা নিউজে লিখেছি তারুণ্যের সময় খেয়ে ফেলছে বিসিএস। আমার মনে হয় কয়েকদিন পর লিখতে হবে তারুণ্যের মাথা খেয়ে ফেলছে বিসিএস।
আমি আবারও বলছি বিসিএস ক্যাডার হতে চাওয়াকে আমি দোষের কিছু দেখি না কিন্তু একটা দেশের মেধাবীদের প্রায় সবাই যখন এর পেছনে ছুটবে তার মানে কোথাও ভয়াবহ গলদ আছে। তরুণরা যখন বিসিএসের জন্য প্রিলি কোচিংয়ে ১০ হাজার, লিখিততে ১০ হাজার, মৌখিকে আবার ১০ হাজার টাকা অবলীলায় বিনিয়োগ করছে বুঝতে হবে এই রাষ্ট্রের কোথাও ঘাপলা আছে। এই সাত সকালে ফেসবুকে ঢুকে Bansuri M Yousuf ভাইয়ের লেখাটা পড়ে সেই কথাগুলোই আবার মনে জাগলো। অামি এই মানুষটাকে খুব পছন্দ করি।
ইউসুফ ভাই লিখেছেন যারা ভাবেন, বিসিএস কিংবা সরকারি চাকুরিই ক্যারিয়ারের জগতে প্রথম এবং শেষ চাবিকাঠি এবং বিসিএসই ছাত্রদের একমাত্র গোল হওয়া উচিৎ, তাদের বিদ্যার জোর, দূরদৃষ্টি হয়তো অনেক বেশী। এক যুগের অধিক চাকুরি করলেও ফেইসবুকে সেই পদবী এ্যাড করতে পারিনি, শরমে ফেইক আইডি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছি।
ইউসুফ ভাই লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে দেখতাম অনার্স দেয়ার পরপরই ছেলেরা উচ্চ শিক্ষার জন্য ইমেল চালাচালি শুরু করতো। গল্প শুনতাম, কেউ অক্সফোর্ড, কেউ ক্যামব্রিজ থেকে পজিটিভ সাড়া পেয়েছেন। ওমুক তারিখে যাচ্ছেন। কেউ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী থেকে অফার পেয়েছেন। মিষ্টি বিতরণ চলতো। কেউ আবার সার্বিক লাইফস্টাইলের সাথে এডজাস্টিবল প্রোপার চাকুরি পেয়ে আকাশের চাঁদ পেয়ে যেতেন।
এখনো দেখি মিষ্টি বিতরণ। তবে ভিন্ন আমেজে, বিসিএসে চাঞ্চ!! ভর্তির পর থেকে অনেকেই ইমেইল ছেড়ে বিসিএস গাইড নিয়ে বসে যান। অবসরে ব্রিটিশ কাউন্সিলে না গিয়ে কোচিং সেন্টারে যান। প্যারাডিম শিফট!
আক্ষরিক অর্থে এই প্যারাডিম শিফট জাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। মেধা শুন্যতা ক্রমান্বয়ে প্রকট হতে থাকবে। আজ যেখানে ইন্ডিয়া সারা বিশ্বের আইসিটি সেক্টরে দাবড়ে বেড়াচ্ছে, আমরা বিসিএস নিয়ে দাবড়ানির কালচারে ক্রেজি হয়ে পড়ছি। কেন এই প্যারাডিম শিফট?
কারা এই ক্রেইজ বাজারজাত করছেন নিজস্ব অর্থায়নে, ক্যারিয়ার বাজির নামে? একাধিক চক্র জড়িত। কিছু বিশেষ কোচিং সেন্টার এই অর্থের ইনভেস্টর। লাভ তাদের হাজার গুণ। বিসিএসে ভালো রেজাল্টধারীদের দিয়ে সেমিনারের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বিশাল মার্কেটিং করে নেয়া তাদের উদ্দেশ্য।(অথেনটিক তথ্য সূত্র)
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এসব সেমিনার আয়োজনে না বুঝে হোক আর হীন স্বার্থের কারণে হোক, সবোর্তভাবে সহযোগিত দিয়ে যাচ্ছেন। ভিসি প্রক্টর মহোদয়গণের সশরীরে উপস্থিত থাকারও নজির আছে। অথচ তাঁরা একবারও চিন্তা করেন না, তাঁরা ছাত্রদের মনন বৈশ্বিক পরিমন্ডলের পরিবর্তে চিড়িয়া খানায় আবদ্ধ করে ফেলছেন। দু-এক বিশ্ববিদ্যালয় সাড়া না দিলেই বিপত্তি। বিসিএস ক্রেজের রোষানলে পড়তে হয়।
বিসিএস-ও একবারে অপ্রোয়োজনীয়, তা বলছিনা। নিজ নিজ অভীষ্ঠ লক্ষ ব্যার্থ হলে বিসিএসে ঝুঁকে পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। এখানেও মেধাবিদের প্রয়োজন আছে, দেশের স্বার্থে। আর সেই মেধাবী পেতে হলে বিসিএস রিক্রুটমেন্ট প্রসেসটাও মেধাবিদের হাতেই সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। যাতে কোচিং করে বিসিএসের সপ্ন না দেখতে পারে, দেখাতে পারে।
ইউসুফ ভাইয়ের সাথে যোগ করে অামি অারেকটু বলতে চাই কোটা পদ্ধতির সংস্কার হোক। বিসিএস পদ্ধতি এমন হোক যাতে সৃজনশীল মেধাবী ছেলেদের সারাবছর গাইড মুখস্থ করতে না হয়। কিন্তু এগুলোর চেয়েও অনেক বেশি জরুরী জীবনবোধ। বিসিএস ক্যাডারই জীবনের একমাত্র গোল কখনো হওয়া উচিত নয় অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন বলছি দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদেরও বিষয়টি ভাবা উচিত।
অাচ্ছা এই যে প্রতি বছর দুই থেকে তিন লাখ তরুণ বিসিএস দেয়, তাদের মধ্যে দুই থেকে তিন হাজার ক্যাডার হয় বাকিদের জীবন কী স্বার্থক নয়? খোঁজ নিন দেখবেন তারাও ভালো অাছে। তাই অামি খুব করে চাই জীবনবোধটা জাগবে অামাদের তরুণদের মধ্যে। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে তারা ভিজবে, পাখির গান শুনবে, কবিতা লেখার চেষ্টা করবে, নানা ধরনের বই পড়ে অানন্দ খুঁজবে অার সবশেষে ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে। অাপনি অামি যে পেশাতেই থাকি না কেন সত্যিকারের মানুষ হতে পারলেই জীবনটা স্বার্থক। তাই অাসুন শুধু ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর না হয়ে অামরা মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি।

