সরেজমিন: পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া

Spread the love

পাঁচ পরিবারের খোঁজ রাখেনি কেউ

শরিফুল হাসান 

গত ২২ মার্চ ইউপি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন মঠবাড়িয়ায় গুলিতে নিহত ছেলে সোলায়মানের শোকে মায়ের আহাজারি l ফাইল ছবি
গত ২২ মার্চ ইউপি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন মঠবাড়িয়ায় গুলিতে নিহত ছেলে সোলায়মানের শোকে মায়ের আহাজারি l ফাইল ছবি

সীমা আক্তার এখন মানুষের বাড়ি কাজ করে কোনো রকমে নিজের খাবার জোগাড় করেন। কোলের শিশুটি প্রায়ই অসুস্থ থাকে। ডাক্তার দেখানোর মতো টাকা নেই। সীমা মনে করছেন, ভিক্ষা করা ছাড়া তাঁর আর কোনো পথ নেই।
সীমা আক্তারের স্বামী বেলাল মোল্লা গত ২২ মার্চ পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানীসাফা ইউনিয়নে ভোট গ্রহণের দিন সন্ধ্যায় বিজিবির গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এ ঘটনায় নিহত হন আরও চারজন। এই পাঁচজনই ছিলেন চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সমর্থক।
ঘটনার তিন মাস পর গতকাল বুধবার এই পরিবারগুলোর খোঁজ নিতে এসে জানা গেল, তাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে আর্থিকভাবে খুবই অসহায় অবস্থায় আছে তারা।
সারা দেশে ছয় ধাপে যে ইউপি নির্বাচন হয়ে গেল, তাতে মঠবাড়িয়ার ধানীসাফাই একমাত্র ইউনিয়ন, যেখানে এক দিনেই সহিংসতায় পাঁচজনের প্রাণ গিয়েছিল। আহত হয়েছিলেন অন্তত ২০ জন। এই ইউপি নির্বাচনের ফলাফল এখনো স্থগিত। ফলে কোনো চেয়ারম্যান পায়নি এখানকার লোকজন। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিও দ্বিধাবিভক্ত।
সেদিনকার নিহত ব্যক্তিরা হলেন বেলাল মোল্লা, সোহেল মাতুব্বর, শাহাদাত হোসেন, কামরুল মৃধা ও সোলায়মান তালুকদার। ধানীসাফা ইউনিয়নের সাফা ডিগ্রি কলেজের ফলাফলকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় তাঁরা নিহত হন। নিহত ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুন অর রশিদের বাতিল হওয়া ৭৪৬ ভোট বৈধ ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভ করছিলেন।
ঘটনার পরদিন বুড়িরচর গ্রামে বেলালের বাড়িতে গিয়ে দেখা গিয়েছিল মাটির ঘর। সেই ঘরের সামনে মাটি চাপড়ে আহাজারি করছিলেন গৃহবধূ সীমা আক্তার। এখন কেমন আছেন জানতে চাইলে সীমা গতকাল বলেন, ‘মোর স্বামীর কামাইয়ে (আয়ে) সংসার চলত। এহন মুই মানের (মানুষের) বাড়িতে পানি টাইন্না, থালাবাসন ধুইয়া দিনে ৪০-৫০ ট্যাহা কামাই হরি। হেই দিয়া কোনোমতে পোলা দুইডার ভাতের জোগাড় হয়।’
সীমা আক্তার মনে করেন, এখন ভিক্ষা করা ছাড়া তাঁর আর উপায় নেই। তিনি বলেন, ‘১৫ মাসের ছোট পোলাডার অসুখ লাইগাই থাহে। ডাক্তার দ্যাহানের পয়সা নাই। নৌকার লইগ্যা বেল্লাল মইরা গ্যাছে। মরার পর হারুন তালুকদার (চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী) কিছু চাল-ডাল দিয়া গেছে। আওয়ামী লীগের কেউ আমগো খোঁজও নেয় নাই।’
একই গ্রামের সোহেল মাতুব্বর ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। সোহেল ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলেন। তাঁর আয়ে সংসার চলত। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ নিয়েছেন তাঁর স্ত্রী রুমা। সোহেলের বাবা ফজলুল হক বলেন, ‘ছেলের মৃত্যুর পর ওর মা মানজুরা বেগম মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। কয়েকবার পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছে। তাকে এখন সব সময় নজরে রাখতে হয়।’
নিহত সোলায়মান তালুকদার ছিলেন মাস্টার্সের ছাত্র। তাঁকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখেছিল পুরো পরিবার। মৃত্যুর কয়েক দিন পর তাঁর নামে বাড়িতে একটি বেসরকারি ব্যাংকের নিয়োগপত্রও আসে। সোলায়মানের বাবা আনোয়ার হোসেন তালুকদার একটি দোকানে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘বয়স হয়েছে। এই বয়সে কাজ করতে কষ্ট হয়। ভাবছিলাম ছেলেটার চাকরি হলে কাজকর্ম ছেড়ে দিব। ছেলের চাকরি হলো, কিন্তু তার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।’
বুড়িরচর গ্রামের পোনা নদীর সেতু পার হয়ে হরিনপালা গ্রামে নিহত কামরুল মৃধার বাড়ি। কামরুল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক ছিলেন। সংসারের পুরো দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। কামরুলের স্ত্রী বিথি আক্তার নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কামরুলের মা খাদিজা বেগম গতকাল আহাজারি করে বলেন, ‘সব শেষ আমাদের। কামরুলের দোয়া মাহফিলে লোকজন কিছু টাকা দিয়েছিল। এরপর আর কেউ সাহায্য করেনি। আল্লাহ এখন চালাচ্ছে।’
কামরুলের বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে শাহাদাতের বাড়ি। শাহাদাত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শ্রমিকের কাজ করতেন। ভোট দিতে বাড়ি এসেছিলেন। শাহাদাতের স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, ‘শাহাদাৎ ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। তাঁর মৃত্যুর পর ঝিয়ের কাজ করে দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি। কই কেউ তো আমাদের কোনো খোঁজ নিল না।’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছিল এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে। হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোর পক্ষে কোনো মামলা নেওয়া হয়নি। নিহত পরিবারগুলো বিচার পাবে কি না, সংশয়ে আছে।
রাজনীতিতেও বিভক্তি: নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারুন অর রশিদের বদলে বিদায়ী চেয়ারম্যান ফারুক মিয়ার পক্ষে ছিল একটি অংশ। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিকুল ইসলামের পক্ষেও ছিল আরেকটি অংশ। বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসন রফিকুলের পক্ষেই কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন হারুনের সমর্থকেরা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই বিভক্তি এখনো কাটেনি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক মাতুব্বর গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে। আর আমরা তো পাঁচজনের মৃত্যুর বিচার দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। সব জানিয়ে আসছি। দেখি কবে বিচার হয়।’
হারুন অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার পক্ষে নৌকার জন্য কাজ করতে গিয়ে পাঁচজন মানুষ মারা গেল। কিন্তু এলাকার লোকজন কী পেল? আওয়ামী লীগ কী পেল? যারা সেদিন ভোট ডাকাতি করেছিল, মানুষ হত্যা করেছিল, তাদের তো বিচার হলো না?’
তদন্তের অগ্রগতি: মঠবাড়িয়ায় পাঁচজনের নিহতের ঘটনা তদন্তে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফকে প্রধান করে একটি এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মানিকহার রহমানকে প্রধান করে আরেকটি কমিটি করা হয়েছিল। ওই কমিটিগুলো প্রতিবেদনও দিয়েছে।
জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার মো. ওয়ালিদ হোসেন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেদিন ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশেই বিজিবি গুলি চালিয়েছিল। তবে পুলিশের এ ধরনের কোনো ভূমিকা ছিল না। সেদিন নিছক ভুল-বোঝাবুঝি থেকেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।’
প্রশাসনের প্রতিবেদনে ঘটনার জন্য এলাকাবাসীকে দায়ী করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.