শরিফুল হাসান

ঢাকায় প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি বাড়ির ছবি পাওয়া গেল নগর জাদুঘরে। বুড়িগঙ্গার তীরে ওয়াইজঘাটের ৭ নম্বর এই বাড়িটি নীলকর ওয়াইজের। পূর্ববঙ্গে নীলকর ওয়াইজের বিস্তৃত জমিদারি ছিল। তবে তিনি ১৮৫১ সালে ভাওয়াল রাজা কালী নারায়ণের কাছে জমিদারি বিক্রি করে ইংল্যান্ডে চলে যান। এরপর নীলকর ওয়াইজের বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। পরে এই বাড়িতেই ১৯৫৫ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা) প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, উপমহাদেশের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী স্মরণে ১৯৫৫ সালের ১৭ মে ঢাকায় বুলবুল ললিতকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাফা প্রতিষ্ঠায় তৎকালীন শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনীতিবিদেরা এক হয়েছিলেন। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী মাহমুদ নুরুল হুদা। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বুলবুল চৌধুরী ছিলেন ত্রিশ-চল্লিশের দশকে উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী। সেই সময়ে তিনি নাচের দল নিয়ে ইউরোপে গিয়েছিলেন। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৯৫৪ সালের ১৭ মে বুলবুল মারা যান। বন্ধুর স্মরণে একটি একাডেমি করার সিদ্ধান্ত নেন মাহমুদ নুরুল হুদা, যিনি নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। বাফা করার জন্য তিনি নীলকর ওয়াইজের পরিত্যক্ত বাড়িটি বেছে নেন। ঢাকা জেলা কর্তৃপক্ষের সচিবের পরামর্শে ১৯৫৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে হুদা ওই বাড়িতে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমি’র সাইনবোর্ড লাগান। পরে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী একাডেমির নামে বাড়িটি বরাদ্দের নির্দেশ দেন। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা, চারু ও কারুশিল্পে শিক্ষাদান এবং শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে গবেষণা পরিচালনা করে চলেছে। বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল নিয়ে এখানকার ছাত্ররা বিভিন্ন দেশে গিয়ে অনুষ্ঠান করে সুনাম অর্জন করেছেন। এই একাডেমির অন্যতম অবদান সংস্কারমুক্ত সংস্কৃতিচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। একসময় নৃত্যকলা সম্পর্কে মুসলিম সমাজে বিরূপ ধারণা ছিল। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি সেই ধারণা ভেঙে দিয়ে নৃত্যকলাকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। কেউ এখানো ওয়াইজঘাটে গেলে নীলকর ওয়াইজের বাড়ি, অর্থাৎ বর্তমান বুলবুল ললিতকলা একাডেমি দেখে আসতে পারেন। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি অক্ষুণ্ন আছে। সংগীত, নৃত্য ও যন্ত্রশিল্পী তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের মৌলিক সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করছে।



