লিবিয়ায় শ্রমবাজার নিয়ে আবার অনিশ্চয়তা
শরিফুল হাসান
বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে আবার অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। লিবিয়া এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না। লিবিয়ায় বসবাসরত কয়েকজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও প্রবাসী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) বলেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে না জানলেও তাদের কাছেও এমন খবর রয়েছে। সমস্যা সমাধানের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির একটি ব্রিটিশ কোম্পানির ব্যবস্থাপক বাংলাদেশি ইয়াহহিয়া খান টেলিফোনে প্রথম আলোকে জানান, সম্প্রতি তাঁর প্রতিষ্ঠান দেড় হাজার বিদেশি কর্মী নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বাংলাদেশ থেকে এসব কর্মী নেওয়ার আগ্রহ জানান। কিন্তু লিবিয়া সরকার তাঁদের জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে তারা কোনো শ্রমিক নেবে না। তিনি বিষয়টি নিয়ে ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি। পরে তাঁরা বাধ্য হয়ে ভিয়েতনাম থেকে শ্রমিক নেন। লিবিয়ায় প্রবাসী বাগেরহাটের আনিসুল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, এপ্রিলের প্রথম থেকে তাঁরা শুনছেন, লিবিয়া আর বাংলাদেশি শ্রমিক নেবে না। এ খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁরা দূতাবাস ও বিভিন্ন মহলে যোগাযোগও করেছেন। কিন্তু দূতাবাসের কর্মকর্তারা বিষয়টি স্বীকার করছেন না। হঠাৎ লিবিয়ার এমন সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চাইলে কয়েকজন লিবিয়াপ্রবাসী প্রথম আলোকে জানান, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তাঁরা জানেন না। তবে লিবিয়ার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বলছে, বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান প্রকৌশলী বা দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর কথা বলে অদক্ষ শ্রমিক পাঠাচ্ছে। এ ছাড়া সৌদি আরব বাংলাদেশি শ্রমিক নিচ্ছে না বলে লিবিয়াও এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে তাঁরা শুনেছেন। এ বিষয়ে জানতে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) আহসান কবির সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে লিবিয়া কিছু জানায়নি। তারা মাঝে-মধ্যেই এমন করে। ভিসা বন্ধ রাখে। তবে ২৯ জুন থেকেই লিবিয়া আবার লোক নেবে, এমন বার্তা পাওয়া গেছে। জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা জানান, বিশ্বমন্দার কারণে ২০০৯ সালে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েতসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে সংকটের সময়ে বাংলাদেশের একটি বড় বাজার ছিল লিবিয়া। জাল ভিসা, প্রতারণাসহ নানা কারণে সেখানেও শ্রমিক পাঠানো নিয়ে সমস্যা হয়। সমস্যা সমাধানে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ১১ জানুয়ারি লিবিয়া সফরে যায়। সফর শেষে ১৬ জানুয়ারি দেশে ফিরে কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও বায়রার নেতারা জানান, লিবিয়া বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি করে চিকিৎসক, নার্সসহ কৃষি ও নির্মাণ খাতে প্রচুর কর্মী নিয়োগের আগ্রহ জানিয়েছে। সফরে লিবিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা চুক্তিও হয়। বাংলাদেশ সরকার পর্যায়ক্রমে লিবিয়াকে পাঁঁচটি আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করে দেবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিনিধিদলের ওই সফরের পর লিবিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক যাওয়া বাড়ে। কয়েক মাস ধরে গড়ে তিন হাজার শ্রমিক সেখানে যান। ওই সফরে সিদ্ধান্ত হয়, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে লিবিয়া সরকার এখন থেকে চাহিদাপত্র পাঠাবে। এর ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ হবে। কিন্তু এপ্রিলের পর থেকে লিবিয়া চাহিদাপত্র পাঠাচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহও দেখাচ্ছে না।জানতে চাইলে বিএমইটির মহাপরিচালক খোরশেদ আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, লিবিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের কিছু জানায়নি। তবে এপ্রিল থেকে লিবিয়ায় শ্রমবাজারে আবার কিছু সমস্যা হচ্ছে বলে তাঁদের কাছেও খবর রয়েছে। সমস্যা সমাধানে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। জুনের প্রথম সপ্তাহে লিবিয়ার উচ্চপর্যায়ের চার সদস্যের একটি সরকারি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসবে। তাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে। আশা করা যাচ্ছে, সে সময়ে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে।জানা যায়, লিবিয়ায় বর্তমানে ৮৩ হাজার বাংলাদেশি আছেন। বিএমইটি ও বায়রা সূত্র জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে লিবিয়ায় ২০০৯ সালে একযোগে উন্নয়ন ও পুনর্গঠনকাজ শুরু হয়। এতে বিপুলসংখ্যক কর্মীর চাহিদা সৃষ্টি হয়, যা এখনো রয়েছে।



