কতো টাকা হলে সাংবাদিক কেনা যায়?

Spread the love

দুপুর থেকে মনটা বেশ খারাপ। একই সাথে প্রচণ্ড অপমানিতও বোধ করছি। আচ্ছা সাংবাদিকদের মানুষ কী ভাবে? বিশেষ করে রাজনীতিবিদরা। তাদের কী ধারনা টাকা হলেই সাংবাদিকদের কেনা যায়?

মন খারাপের কারণ বলছি। গত কয়েকদিন ধরেই নির্বাচন কাভার করতে ঢাকার বাইরে আছি। নির্বাচনের নিউজ করতে গিয়ে নানা জায়গায় মেয়র প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে। আজ দুপুরে তেমনি একটা নিউজের বক্তব্যের জন্য আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক মেয়র প্রার্থীকে ফোন দিলাম। বললাম পৌরসভা সম্পর্কিত কিছু বিষয় জানতে চাই। তিনি বললেন, ফোনে নয় তিনি বাসায় কথা বলবেন। আমি যেন তার বাসায় যাই। বাধ্য হয়েই রাজি হতে হলো।

শহরে তার বিরাট বাড়ি। সামনে সিসি ক্যামেরা। কলিং বেল চাপার কিছুক্ষণ পর এক সহকারী এসে তিনতলায় তার কক্ষে নিয়ে গেলেন। সেখানে তখন আরো তিনজন বসা। একটি মেয়ে এসেছে পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগের জন্য তদবির করতে। তিনি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন একজন সাংবাদিক এসেছে। তিনি তার সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি যেন পাশের কক্ষে বসেন। এদিকে আমার সঙ্গে থাকা আমাদের ফটোসাংবাদিককে চিনতে পারলেন। বললেন আপনি না বিএনপির রাজনীতি করেন। মেয়র এ সময় বললেন, তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেও বিএনপি-জামায়াত সবার সঙ্গেই আছেন।

যাই হোক আমি আমার প্রশ্নে ফিরলাম। তিনি আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে শুরু করলেন। আমি দুপুরে খেয়েছি কী না জানতে চাইলেন। বললাম আমরা খেয়ে এসেছি। বাস্তবে তখন আমি একটা সিঙ্গাড়া ছাড়া কিছুই খাইনি। ফটোসাংবাদিককে নিয়ে সারাদিন ঘুরতে গিয়ে আমাদের দুজনের কারোই খাওয়া হয়নি। বাট কোন প্রার্থীর বাড়িতে আমি খাই না। তিনি তখন আমাকে মিস্টি খেতে বললেন।। আমি জানালাম, ডায়েট করছি। মিস্টি খাই না। যাই হোক তাকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে আসবো এমন সময় তিনি একগাদা পাঁচশ টাকার নোট বের করে আমাকে দিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে আসলেন।

ঘটনার তাৎক্ষণিকতায় আমি স্তম্ভিত। প্রচণ্ড আহতও বোধ করলাম। টাকাগুলো না ছুয়েই আমি তার দুই কাধ ধরে সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম সাংবাদিকদের কী ভাবেন আপনারা? মেয়র সাহেব থতমত খেলেন। তার বোধহয় এমন অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। আমি কোন কথা না বলে তিনতলা থেকে সিড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে এলাম। তিনি আমার সাথে সাথে নামতে লাগলেন আহত মুখ নিয়ে। আমি পেছন না ফিরে চলে এলাম। তখনো তার দৃষ্টিতে বিস্ময় হযতো।

মেয়রের বাড়ি থেকে এসে আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। রাগে গা জ্বলছে। রাগ কমাতে আমাদের স্থানীয় রিপোর্টারের সাথে কতোক্ষণ চিল্লাইলাম।বললাম এই লোক এমন কেন? প্রতিনিধি জানালেন ব্যাবসা করে এই লোক অনেক টাকা কামিয়েছেন। কোন দলের রাজনীতি করতেন না। কিন্তু তিনমাস আগে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই  সবাইকে হারিয়ে মনোনয়ন নিয়েছেন। মেয়র হিসেবে তিনি আয় করার চেয়ে বেশি খরচই করেছেন। বোকা বলেই আপনাকে এভাবে টাকা সাধতে গিয়েছে।

আমার তখনো গা জ্বলছে। মনে পড়লো পাঁচ বছর আগে সিটি করপোরেশন নিবাচন কাভার করতে যাওয়া এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার কথা। প্রথম আলাপেই সাংবাদিকদের নিয়ে তিনি নানা কথা বললেন। একপর্যায়ে জানতে চাইলেন কত হলে তোমাকে কেনা যায়? হয় লাখ, নয়তো কোটি। সব সাংবাদিককে কেনা যায়। আমি সেদিনও আজকের মতো অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। বুদ্ধিমান সেই রাজনীতিবিদ হাসিমুখে বললেন, দেখলে কীভাবে তোমার সঙ্গে ফান করলাম।

উল্লেখযোগ্য আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে। আমি বহুদিন ধরে জনশক্তি বীটে রিপোর্ট করছি। শুনি এই বিটে কোটি কোটি টাকার খেলা চলে। আমি ছোট মানুষ দূরে থাকি এদের কাছ থেকে। এমনকি তাদের কোন অনুষ্ঠানে সচারচর যাই না। পরে সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যের কপি নিয়ে নেই। তবে সেদিন মালয়েশিয়ার বাজার নিয়ে জরুরী সংবাদ সম্মেলন ছিল। বায়রার এক নেতার যাকে আমি সৎ মনে করি তার বারংবার অনুরোধ এবং বায়রার তখনকার জনসংযোগ কর্মকর্তার অনুরোধে সেদিন গিয়েছিলাম। যাই হোক সংবাদ সম্মেলন শেষে দেখি বায়রার এক নেতা সাংবাদিকদের হাতে টাকা দিচ্ছেন। চরম মেজাজ খারাপ হলো। গালিগালাজ করে চলে এলাম। তারা অবশ্য বারবার সরি বলছিলো। তবে এরপর বায়রা কোনদিন প্রকাশ্যে এভাবে কোন সাংবাদিককে টাকা দেয়নি, অন্তত আমার সামনে।

আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে। বিদেশি তহবিল পাওয়া এক এনজিও সাংবাদিকদের ডেকেছে কিছু বলতে। আমার কথা বলা শেষে এক জায়গায় সেই এনজিওর কর্ণধার সাইন করতে বললেন। সেখানে দেখি আমাকে দশ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। আমি আপত্তি করলাম। তারা তখন বললো এইটা বাজেট করা। বিদেশি তহবিল। এভাবেই পিপি করা। আমি বললাম আচ্ছা আমি সাইন করছি এই শর্তে যে টাকাটা দিয়ে এখুনি কোন অসহায় বিদেশ ফেরত মেয়েকে একটা সলাই মেশিন কিনে দেবেন। তারা রাজি হলো। আমি টাকাটা না ছুয়েই ফেরত এলাম।

আবারো গল্পের শুরুর মেয়রের কাছে ফিরি। আমি যখন দুপুর থেকে মন খারাপ করে এসব ভাবছি সন্ধ্যায় তখন মেয়র সাহেব ফোন দিলেন। আমি প্রতিবারই কেটে দিলাম। তারপরেও মনে হলো নিউজের জন্য আমার যেহেতু তাকে ফোন দিতে হবে সামনেও কাজেই ফোনটা ধরি। তবে ফোন ধরার পর থেকে তিনি ক্রমাগাত মাফ চাইতে লাগলেন। বললেন ভাই কতো সাংবাদিক আসে। উল্টাপাল্টা লেখে। তাই টাকা দিতে হয়। আমার ক্ষেত্রে কোন কিছু না ভেবেই করেছেন পুরানো অভ্যাসমতো। আমি যেন মেয়র না তাকে ভাই মনে করে হলেও তাকে ক্ষমা করি।

আমি তাকে বললাম ভাই আপনি হয়তো কয়েকজন খারাপ সাংবাদিক দেখে সবাইকে তাই ভাবছেন। ভাই পুলিশ ঘুষ খায় তার মানে এই নয় দেশে কোন ভালো পুলিশ নেই। সব পেশার ক্ষেত্রে একই কথা খাটে। ভালো মন্দ সব জায়গায় আছে। তিনি আমার সাথে একমত পোষণ করে বললেন তিনি বুঝতে পেরেছেন। আবারো মাফ চাইলেন। আমি বললাম বিবেচনা করবো তবে সাংবাদিকতা পেশাটাকে কোনদিন অসম্মান করবেন না।

রাতে নদীর পাড়ে এলাম। মন খারাপ এখন কিছুটা কমেছে। মনে মনে ভাবছি আমরা সাংবাদিকরা এই পেশাটাকে কই নিয়ে গিয়েছি। বেশিরভাগ মানুষের ধারনা টাকা ছাড়া সাংবাদিকরা কিছু লিখে না। আর টাকা হলেই হলেই বোধহয় সব সাংবাদিককে কেনা যায়।

সাংবাদিকতা পেশার বাইরে থাকা যারা এমনটা ভাবছেন তাদের বলি ভাই সব এক পাল্লায় মাপবেন না। এই ধরুন আমার নিজের কথাই বলি। আমার অনেক টাকা নেই। সম্পদ নেই। বাস্তবে কোনদিন হোক সেটাও চাই না। এর বদলে মোটামুটি খেয়ে পরে জীবনটা চললেই আমি খুশি। আর, হ্যা জীবনে চলার জন্য টাকা লাগে। তবে আমি চাই সেটা সৎভাবে আয় করতে হবে। লাখ টাকার বেশি বেতন দিলে আমি হয়তো অন্য কোথাও চলে যাবো জীবন বাঁচাতে, আরেকটু ভালো করে বাঁচতে। কিন্তু কোনভাবে কোনদিন এক মুহুর্তের জন্যও অসৎ হতে চাই না। আল্লাহ যেন আমাকে হারাম উপার্জন কোনদিন না করায়। আর কোনদিন যেন সাংবাদিকতা পেশাটাকে অসম্মাননা না করায়।আমার সেইসব সাংবাদিক ভাইদের বলছি-ভাই অন্য পেশায় গিয়ে টাকা কামান। দয়া করে এই পেশাটাকে নষ্ট করবেন না।

অহঙ্কার করে নয়, প্রচণ্ড আত্মসম্মান নিয়েই উপরের কথাগুলো বলছি। আমি জানি আমার মত অনেক সাংবাদিকই না খেয়ে থাকবে তবু অসৎ হবে না। কাজেই যারা সাংবাদিকদের কিনতে চান-তাদের বলি টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published.