সিটি নির্বাচন

Spread the love

গাজীপুরে আ.লীগএকা

শরিফুল হাসান 

গাজীপুরে আ.লীগএকা

চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো গাজীপুরেও স্থানীয় সমস্যার চেয়ে জাতীয় বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে বিরোধী দলের সরকারবিরোধী প্রচারণা তুঙ্গে।এদিকে সদ্য অনুষ্ঠিত চার সিটি করপোরেশনে পরাজয়, প্রার্থী মনোননয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব ও নাটকীয়তা এবং বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থীর পক্ষে হেফাজতে ইসলাম, এমনকি ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের সক্রিয় প্রচারণা আওয়ামী লীগকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। ফলে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একা হয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন দল। তবে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী সরকারি দল।অন্যদিকে চার সিটি করপোরেশনে জয় পেয়ে ফুরফুরে মেজাজে আছে বিএনপি। সরকারের নানা ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে ভোটের মাঠে তারা অনেকটাই এগিয়ে আছে। পাশাপাশি হেফাজত ও জাতীয় পার্টিকে পাশে পেয়ে তারা নির্বাচনী প্রচারণায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।টঙ্গী পৌরসভার ১৭ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা আজমত উল্লা খান এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী। ১৫ বছর ধরে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকায় সংগঠনের অধিকাংশ নেতা-কর্মীও তাঁর সঙ্গে আছেন। কিন্তু জাতীয় বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতার সমালোচনা তাঁকে শুনতে হচ্ছে। বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নান ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর রাজনীতিতে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। জেলা ও পৌর বিএনপির অধিকাংশ কমিটিতে তাঁর অনুসারী নেতা-কর্মী নেই। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসনের এই উপদেষ্টাকে নির্বাচনে জয়ী করতে সব বিভেদ ভুলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান উদ্দিন সরকার ও জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক কাজ করছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, ১৯৮৬ সালে গাজীপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কখনোই জয় পায়নি বিএনপি। আর টঙ্গীতে টানা তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন আজমত উল্লা। এ ছাড়া পরপর তিনটি সংসদ নির্বাচনে শহরের এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই জয়ী হয়েছেন। কাজেই এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না।

তবে জেলা আওয়ামী লীগের অন্য কয়েকজন নেতা বলেন, ১৪ দল থাকলেও আওয়ামী লীগকে একাই সব সামলাতে হচ্ছে। এর মধ্যে ‘জাহাঙ্গীর নাটক’ অনেক পিছিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগকে। হাইকোর্টের নির্দেশে প্রার্থিতা টিকে যাওয়ার পর প্রচারণা শুরু করা মাত্র জাহাঙ্গীরকে জোর করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া, পাঁচ দিন পর গাজীপুরে এনে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া—ইত্যাদি ঘটনা আওয়ামী লীগের জন্য ভালো হয়নি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যাঁরা জাহাঙ্গীরের সমর্থক, আজমত উল্লার পক্ষে তাঁদের সেভাবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেন, জাহাঙ্গীর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় তাঁর আনারস প্রতীক ব্যালট পেপারে রয়েই যাচ্ছে। ফলে তাঁর কর্মী-সমর্থকদের একটা অংশ আনারস প্রতীকে ভোট দিতে পারেন।

অবশ্য জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি আজমত উল্লার পক্ষে প্রচারণায় নামার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সাধারণ কর্মীদের মনোভাব জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সাড়ে চার বছর ধরে সাধারণ যেসব নেতা-কর্মীকে আমার পক্ষে এনেছি, রাতারাতি তাঁদের মনোভাব পাল্টে ফেলা সম্ভব নয়। তবে আমি চেষ্টা করছি।’

চার সিটির মতোই হেফাজতে ইসলাম গাজীপুরেও আলোচিত। এখানে হেফাজতের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে এম এ মান্নানের পক্ষে কাজ করছেন। কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক এই সংগঠনের গাজীপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, সরকার মতিঝিলে যে তাণ্ডব চালিয়েছে, সেটি ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে গাজীপুরের সব নেতা-কর্মী মান্নানের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ।

বিএনপির পক্ষে হেফাজতের দাঁড়ানোর বিষয়টি আওয়ামী লীগ স্বাভাবিকভাবে নিলেও জাতীয় পার্টিকে পাশে না পাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না সরকারি দলটি। এরশাদ মহাজোটে থাকায় এবং বিএনপির প্রার্থী এম এ মান্নানের সঙ্গে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি কাজী মাহমুদ হাসানের দ্বন্দ্ব থাকায় আওয়ামী লীগ ধরে নিয়েছিল, জাতীয় পার্টিকে তারা পাশে পাবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি উল্টো। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এরশাদের বৈঠকের পর আওয়ামী লীগ নেতারা ভেবেছিলেন, জাতীয় পার্টি তাঁদের পাশে আসবে। কিন্তু শনিবার জেলা ও পৌর জাতীয় পার্টির সব নেতা বৈঠক করে মান্নানের পক্ষেই তাঁদের অবস্থান ঘোষণা করেন।

চার সিটিতে পরাজয়, জাহাঙ্গীর নাটক, সরকারের হেফাজতবিরোধী অভিযান, পদ্মা সেতু, শেয়ারবাজার, হল-মার্ক কেলেঙ্কারির পাশাপাশি সরকারের নানা ব্যর্থতা এই নির্বাচনে আলোচনার সামনে উঠে এসেছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা (জিএসপি) স্থগিতের বিষয়টি সরকারের আরেকটি ব্যর্থতা হিসেবে তুলে আনছে বিএনপি।

এত সমস্যার মধ্যেও আওয়ামী লীগই জয়ী হবে বলে দাবি করছেন আজমত উল্লার নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক আ ক ম মোজাম্মেল হক। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গাজীপুর আওয়ামী লীগের দুর্গ। প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও গাজীপুরের মানুষ আওয়ামী লীগের প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মান্নানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক হাসান উদ্দিন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব বিভেদ ভুলে আমরা এখন ঐক্যবদ্ধ। গাজীপুরে আমাদের জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। কারণ, এ সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা নেই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.