শরিফুল হাসান
জনশক্তি রপ্তানি খাতে মহাজোট সরকারের তিন বছরের সাফল্য-ব্যর্থতার চিত্রটি মিশ্র। এই সময় স্মার্ট কার্ডের প্রবর্তন, অনলাইনে নাম নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সুবিধার প্রচলন, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, প্রশিক্ষণসুবিধা সম্প্রসারণ ও বিদেশগামী নারী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো অগ্রগতি হয়েছে।এ ছাড়া শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরসহ গত তিন বছরে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর জন্য নানা উদ্যোগ ছিল। তবে জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা বলছেন, গত তিন বছরে সরকারের অনেক সফল উদ্যোগ থাকলেও সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার মতো প্রধান শ্রমবাজার আবার চালু করতে না পারা একটি বড় ব্যর্থতা। আর বিশ্লেষকেরা বলছেন, উন্নত প্রযুক্তি চালু করার পরও বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতারণা বন্ধ হয়নি, কমেনি অভিবাসন খরচও। দেশের বিমানবন্দরে হয়রানি ও বিদেশে দূতাবাসে গিয়ে সহায়তা না পাওয়ার মতো পুরোনো সমস্যাগুলোও রয়েই গেছে।তবে সরকারি মহলের লোকজন দাবি করছে, প্রধান কয়েকটি শ্রমবাজার চালু না থাকলেও জনশক্তি রপ্তানির অবস্থা এখন অতীতের চেয়ে ভালো।পরিসংখ্যান যা বলে: সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৪ লাখেরও বেশি কর্মী চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জোট সরকারের পাঁচ বছরে যতসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেছেন, মহাজোট সরকারের তিন বছরে তার চেয়ে বেশি কর্মী গেছেন। এই সরকারের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সিঙ্গাপুর, জর্ডান, লেবানন ও বাহরাইনে জনশক্তি রপ্তানি বেড়েছে। তবে জোট সরকারের সময় সৌদি আরবে যত কর্মী গেছেন, এখন সেখানে জনশক্তি রপ্তানি প্রায় বন্ধ আছে।এদিকে, বেশ কয়েক বছর ধরেই রেমিট্যান্সের প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমান সরকারের তিন বছরেও তা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৯ সালে ৭৪ হাজার কোটি, ২০১০ সালে ৭৭ হাজার কোটি ও ২০১১ সালের এখন পর্যন্ত ৭৬ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স (প্রবাসী-আয়) এসেছে।সরকার ও বিশেষজ্ঞের কথা: বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন মনে করেন, সব মিলিয়ে শ্রমবাজারের অবস্থা অতীতে ভালো ছিল না। এ খাতে সরকারের তিন বছরের অর্জন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথম আলোকে জানান, জনশক্তি রপ্তানিতে মন্দা যাচ্ছে বলে প্রায়ই যেসব কথা বলা হয়, সেগুলো ভিত্তিহীন। বর্তমান সরকারের তিন বছরে বিদেশে যত লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে, জোট সরকারের পাঁচ বছরেও তা হয়নি।খন্দকার মোশাররফ আরও বলেন, ‘আমরা স্মার্ট কার্ড ও অনলাইনে নিবন্ধনসহ আধুনিক সব প্রক্রিয়া চালু করেছি। ফলে প্রতারণা কমেছে। নারী শ্রমিকেরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। আমরা অভিবাসন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করেছি। সৌদি আরবের বাজার চালু করার চেষ্টা চলছে। মালয়েশিয়ার বাজার না খুললেও সেখানে অবৈধ তিন লাখ বাংলাদেশি বৈধ হচ্ছেন।’অভিবাসনবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা রামরুর সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার সরকারের এ কার্যক্রম সম্পর্কে মিশ্র মূল্যায়ন করেছেন। তিনি জানান, স্মার্ট কার্ড ও প্রবাসী ব্যাংক চালুসহ তিন বছরে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ ছিল, এটি সত্যি। তবে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার জন্য যতটা করার কথা ছিল, তা করা হয়নি। এখনো বিদেশে শ্রমিকদের নানা দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। দূতাবাস থেকে তাঁরা ঠিকমতো সহায়তা পান না। তিন বছর ধরে চেষ্টা চললেও এখনো অভিবাসন খরচ নির্ধারণ করা যায়নি।অভিবাসনবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ জানান, এককথায় বলতে গেলে, খাপছাড়া অনেক উদ্যোগ আছে, কিন্তু সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। নারী অভিবাসীসহ প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষা করা, বিদেশের শ্রমবাজার বাড়াতে দক্ষ শ্রমিক তৈরি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অভিবাসনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়াসহ দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা নেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি। অভিবাসন খরচ কমেনি, বন্ধ হয়নি প্রতারণা: বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা উচ্চ ব্যয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েকবার এ ব্যয় ‘যৌক্তিক পর্যায়ে’ কমিয়ে আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে তিন বছরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা করতে পারেনি। ব্যয় কমাতে সরকারিভাবে লোক পাঠানোর কথা বলা হলেও তেমনভাবে তা শুরু হয়নি।বিদেশগামী নিরীহ কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণাও দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া বিমানবন্দরে কিংবা বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোয় শ্রমিকেরা ভালো ব্যবহার পান না বলেও অভিযোগ আছে।প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্র্যান্টস অ্যালায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (আইএমএআরএফ) জাতীয় সমন্বয়ক আনিসুর রহমান খান প্রথম আলোকে জানান, বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুটি সাধারণ অভিযোগ। প্রথমত, বিমানবন্দরে হয়রানি করা হয় এবং দূতাবাসগুলোতে গেলে তাঁরা ভালো ব্যবহার পান না। এই সমস্যার সমাধান করা জরুরি।প্রবাসীকল্যাণসচিব জাফর আহমেদ খান বলেন, ‘অভিযোগগুলো মিথ্যা নয়। প্রায়ই আমাদের শ্রমিকেরা দূতাবাসে গেলে ভালো ব্যবহার পান না। তবে দূতাবাসের লোকবলের অভাব আছে। আমরা তাই লোকবল বাড়ানো ও কর্মকর্তাদের প্রবাসীবান্ধব করার চেষ্টা করছি।’রপ্তানিকারকদের কথা: জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা পুরোনো শ্রমবাজারগুলো চালু করতে সরকারের ‘ব্যর্থতায়’ উদ্বিগ্ন। তারা মনে করে, এ খাতে মহাজোট সরকারের তিন বছরে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এটি। সৌদি আরবের উদাহরণ দিয়ে তারা বলেছে, ১৯৯৭ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সে দেশে প্রতিবছর গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ কর্মী গেছেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের তিন বছরে গেছেন মাত্র ৩০ হাজারের মতো। এ সময় ফিরে আসেন এরও বেশি, ৫০ হাজার লোক। জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে তিন দশকের মধ্যে কখনো এমন বিপর্যয় হয়নি। সরকারি সূত্র ও ব্যবসায়ী মহল—উভয়েরই মতে, এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক।সম্প্রতি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায়ও একই অবস্থা। তিন বছর ধরে দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ আছে। গুরুত্বপূর্ণ বাজার কুয়েতের চিত্রও তাই।জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত, কাতার—এগুলো হলো বাংলাদেশের আসল শ্রমবাজার। কিন্তু এগুলো চালু করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে; বরং এসব দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নেতিবাচক হয়ে উঠেছে। এই সংকট কাটাতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানের জন্য বর্তমান সরকার পাঁচটি কমিটি করে তাদের বিভিন্ন দেশে পাঠায়। কিন্তু তিন বছরে সেই অর্থে নতুন কোনো বড় শ্রমবাজার খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ।প্রযুক্তিসহ অগ্রগতি: জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির সূচনা করতে সরকার তিন বছরে উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদেশগামী কর্মীদের আঙুলের ছাপ দিয়ে ‘স্মার্ট কার্ড’ নেওয়া বাধ্যতামূলক করায় সেই জালিয়াতির সুযোগ বন্ধ। এখন কর্মীদের তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে বিএমইটির ডেটাবেইসে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। অনলাইনে ভিসা যাচাই ও অভিযোগ দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দালালপ্রথা ভেঙে একটি ডেটাবেইস গড়ে তোলার জন্য দেশের সব জেলায় বিদেশগামীদের নাম নিবন্ধন কার্যক্রম চালু হয়েছে। মোবাইলের মাধ্যমেও এখন নাম নিবন্ধন করা হয়।বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণসচিব জাফর আহমেদ খান প্রথম আলোকে জানান, এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে যেমন স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তেমনি প্রতারণাও অনেক কমে আসছে।বিদেশগামীদের দক্ষ করতে সরকার ৩০টি জেলায় নতুন ৩০টি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও পাঁচটি নৌপ্রযুক্তি শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া প্রবাসীদের দক্ষতা উন্নয়নে গঠন করা হয়েছে একটি তহবিল। সরকারিভাবে মাত্র ১০ হাজার টাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়ায় নারীদের কাজ নিয়ে বিদেশে যাওয়া বেড়েছে। নারীদের জন্য ২১ দিনের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের একটি বড় উদ্যোগ হলো প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা।ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সি এম কয়েস সামি প্রথম আলোকে বলেন, দেশে ৫০টি ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও কেউ বিদেশগামী কর্মীদের জন্য এগিয়ে আসেনি। সরকার স্বল্প সুদে ও সহজে কর্মীদের জামানতবিহীন ঋণ দিচ্ছে। কর্মীদের বিমা এবং অপ্রত্যাশিতভাবে দেশে ফিরে আসতে অর্থ-সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।



