লেখা: শরিফুল হাসান

সুরম্য ও বহুতল একটি ভবনের সামনে উচ্ছ্বসিত মানুষ। কয়েকজনের হাতে পতাকা। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মুহূর্তের ছবিটি দেখলেই বোঝা যায়, এটি সে সময়ের ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল। ফেসবুকে ঢাকার পুরোনো ছবির পেজ ‘ঢাকা: ফোর হানড্রেড ইয়ারস হিস্টোরি ইন ফটোগ্রাফি’র সূত্র ধরে ছবিটি পাওয়া গেল।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই হোটেলটির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি বাংলাদেশের প্রথম পাঁচ তারকা হোটেল। ১৯৬৬ সালে ৩০০টি কামরা নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। বিদেশি পর্যটক, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই ছিলেন এখানে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করার আগে ঢাকায় থাকা বিদেশি সাংবাদিকদের এই হোটেলে রেখে পরদিন বিমানে তুলে দেওয়া হয়। সেই সময় ব্রিটিশ তরুণ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হোটেলেই লুকিয়ে থাকেন। কারফিউ উঠে গেলে ২৭ মার্চ সকালে হোটেলের কর্মচারীদের সহযোগিতায় ছোট্ট একটি মোটরভ্যানে করে তিনি ঘুরে ঘুরে দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা। ঢাকায় দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ চিত্র উঠে আসে তাঁর প্রতিবেদনে। পরে পাকিস্তান সরকার তাঁকে জোর করে দেশ থেকে বের করে দেয়। এরপর কলকাতা থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের খবর পাঠাতেন। নিউইয়র্ক টাইমস-এর আরেক সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গও আশ্রয় নিয়েছিলেন এই হোটেলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হোটেলটি ‘নো ওয়ার জোন’ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। বিদেশি অনেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ছিলেন এখানে। মুক্তিযোদ্ধারা এখানে দুটি সফল গেরিলা অপারেশন চালায়, যার মাধ্যমে বিদেশিরাসহ ঢাকাবাসী গেরিলা যুদ্ধের কথা জানতে পারেন।
১৯৮৪ সাল থেকে হোটেলটি পরিচালনার দায়িত্ব পায় স্টারউড এশিয়া প্যাসিফিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস প্রাইভেট লিমিটেড। এরপর স্টারউডের নামকরা ব্র্যান্ড ‘শেরাটন’ নামে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে হোটেলটি। ২০১১ সালের ১৯ আগস্ট এর মালিকানা ও পরিচালনারও দায়িত্ব বুঝে নেয় সরকার। তখন নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় রূপসী বাংলা। তবে সংস্কারের জন্য ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর দুপুরে বন্ধ করে দেওয়া হয় হোটেলটি। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, ইন্টারকন্টিনেন্টাল নামেই আবার চালু হবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত হোটেলটি।



