শরিফুল হাসান

স্বপ্নের ক্যাডার পদের আশায় বিসিএস পরীক্ষা দেন তরুণেরা। কিন্তু পদস্বল্পতার কারণে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েও বেশির ভাগেরই নন-ক্যাডার পদেও চাকরি মেলে না। ২৮ থেকে ৩৩তম বিসিএসে উত্তীর্ণ এমন প্রায় ১৯ হাজার প্রার্থী প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার কোনো পদেই চাকরি পাননি। বঞ্চিত প্রার্থীরা বলছেন, দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি না পাওয়া খুব কষ্টের। এই সমস্যার সমাধান জরুরি।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৮ থেকে ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় ৩৯ হাজার ৪১৯ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৫৬০ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। বাকি ২০ হাজার ৮৫৯ জন প্রার্থীকে নন-ক্যাডারের জন্য রাখা হয়। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ১৮ হাজার ৯০৬ জনই চাকরি পাননি। এ নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করলেও অবস্থা বদলায়নি।
পিএসসি বলেছে, বারবার তাগাদা দিলেও মন্ত্রণালয়গুলো চাহিদা না দেওয়ায় অতীতে এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থী চাকরি পাননি। তবে এবার ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রায় ৬ হাজার ৫৮৪ প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৫০০ জন নন-ক্যাডার পদে চাকরি পাবেন। এর মধ্যে গত সোমবার করপরিদর্শকের ৩১৯টিসহ ৩৩৮টি পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ৫০০ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
প্রধান শিক্ষক পদে ১ হাজার ১০০ জনের নিয়োগ হবে। এর আগে নিয়োগ পেয়েছেন ১৫৯ জন। পিএসসি বলছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক পদে ১ হাজার ৬০০ জনের এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ৯০০ জনের চাহিদা থাকলেও এ মুহূর্তে মোট ১ হাজার ৬০০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। বাকি পদগুলো মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্য সংরক্ষিত থাকছে।
জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, একটা বিসিএস পরীক্ষায় দুই লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় হাজার জন চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ক্যাডার পদের স্বল্পতার কারণে সবাইকে নিয়োগ করা যায় না। এ জন্যই নন-ক্যাডারের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ বিধিমালা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও দেখা গেছে, একটা বড় অংশই অতীতে চাকরি পায়নি। এটা দুঃখজনক। তবে ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের একটা বড় অংশ নন-ক্যাডারে চাকরি পাবে। এ পর্যন্ত ছয়টি বিসিএসে যা হয়েছে শুধু ৩৪তম বিসিএস থেকে তার চেয়ে বেশি নিয়োগ হচ্ছে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্য সংরক্ষিত রাখতে না হলে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে আবেদনকারীদের সবাই চাকরি পেতেন।
বিসিএসের মাধ্যমে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২৮তম বিসিএস থেকে। ওই বিসিএসে ৫ হাজার ১০৫ জন উত্তীর্ণ হন। এর মধ্যে ২ হাজার ১৯০ জনকে ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। বাকি ২ হাজার ৯১৫ জন নন-ক্যাডারের যোগ্য ছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র ২৯৯ জন চাকরি পান।
একইভাবে ২৯তম বিসিএসে ৩ হাজার ৩৪০ জনের মধ্যে মাত্র ১৯৩ জন, ৩০তম বিসিএসের ২ হাজার ৮১৩ জনের মধ্যে ৩৬৩, ৩১তম বিসিএসের ৩ হাজার ৪১৭ জনের মধ্যে ১২০ এবং ৩২তম বিসিএসের ১ হাজার ৯১২ জনের মধ্যে মাত্র ৬৬ জন নন-ক্যাডারের প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ পান। ৩৩তম বিসিএসের ৭ হাজার ৪৬২ জনের মধ্যে ৩৪৪ জন প্রথম শ্রেণির এবং ৫৬৮ জন দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগ পান। সব মিলিয়ে চাকরি পান মাত্র ১ হাজার ৯৫২ জন। অর্থাৎ এই ছয়টি বিসিএসের নন-ক্যাডারের জন্য রাখা প্রার্থীদের ৯০ শতাংশই চাকরি পায়নি। অবশ্য বিসিএস উত্তীর্ণ কিছু প্রার্থী নন-ক্যাডার পদে যোগ দিতে আগ্রহী না হয়ে বয়স থাকা পর্যন্ত বিসিএস পরীক্ষা দেন।
মন্ত্রণালয়গুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির ৩৯ হাজার ৫৬৪টি এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ৩০ হাজার ৪২২টি পদ শূন্য রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়গুলো পিএসসিতে চাহিদা না পাঠানোয় বিসিএস-উত্তীর্ণ বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নিয়োগ পাননি।
প্রার্থীদের হতাশা: ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ জিবরান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি বিসিএসের পেছনে চার বছর সময় দিলাম। উত্তীর্ণ হলাম। শেষ পর্যন্ত চাকরি না পেলে এর চেয়ে কষ্টের আর কী থাকে। অতীতে দেখেছি, নন-ক্যাডারের অনেকেরই বয়স চলে গেছে, চাকরি মেলেনি।’
একই রকম কথা বললেন মানিক মোহাম্মদ, হুমায়ুন মোরশেদ ও জহিরুল ইসলাম। সিফাত আরা হোসেন ও জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, পিএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান ৩৪তম বিসিএস থেকে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডারে নিয়োগ দিচ্ছেন। তাঁর কাছে অনুরোধ, তিনি যেন বাকিদেরও চাকরি দেন। পিএসসি ও সরকার মিলে চাইলেই বিসিএসে উত্তীর্ণ সবার চাকরি হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা আনসার কর্মকর্তা, খাদ্যপরিদর্শকসহ আরও অনেক পদের চাহিদা ছিল। সেগুলোতে কেন নিয়োগ দিচ্ছে না পিএসসি?
মেহেদি হাসান, আল মাসুম, কানিজ ফাতেমা, অসীম কুমারসহ ২৫-৩০ জন উত্তীর্ণ প্রার্থী বলেন, বিসিএস দিতে দিতে অনেকেরই বয়স শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে সরকারের ৪০-৫০ হাজার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদ শূন্য থাকে। সরকার চাইলে বিসিএসে উত্তীর্ণ সবাইকে নিয়োগ দিতে পারে।
২০১০ সালের ১০ মে প্রজ্ঞাপন করে নন-ক্যাডার বিধিমালা-২০১০ জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, শূন্য পদের ৫০ শতাংশ বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের দিয়ে পূরণ করা হবে। পরবর্তী বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত আগের বিসিএস থেকে নিয়োগ চলবে। ২০১৪ সালে এই বিধি সংশোধন করে প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদের পাশাপাশি দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা পদেও নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু এরপরও চাকরি পাচ্ছেন না সবাই।
পিএসসির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত কষ্ট করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি না পাওয়া দুঃখজনক। মন্ত্রণালয়গুলোর ৫০ শতাংশ পদে বিসিএস উত্তীর্ণদের নিয়োগ দেওয়ার বিধি করা হলেও মন্ত্রণালয়গুলো চাহিদা দিতে আগ্রহী থাকে না। ফলে অধিকাংশই নিয়োগ পান না।’
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা বিসিএস উত্তীর্ণ হন তাঁরা অবশ্যই মেধাবী। আর মন্ত্রণালয়গুলোরও তো লোক দরকার। এত পদ শূন্য থাকার পরও পিএসসিতে তারা চাহিদাপত্র দেয় না বলে অধিকাংশ নিয়োগ-বঞ্চিত থাকেন। এটি অনুচিত।’



