নড়িয়ায় ‘অসহায়’ আ.লীগ প্রার্থীই জিতলেন
শরিফুল হাসান
শেষ পর্যন্ত ভোটাররাই নড়িয়ায় নৌকার ভরাডুবি ঠেকিয়ে দিলেন। নানা বাধার মধ্যে শরীয়তপুরের নড়িয়ার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হায়দার আলী দলের প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল ইসলামকে প্রায় এক হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন। গতকাল বুধবার রাতে রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা করলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।
তবে ফলাফল ঘোষণা নিয়ে তৈরি হয় চরম নাটকীয়তা। বিকেল চারটায় ভোট গ্রহণের পর বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণা করে প্রার্থীর লোকজনকে এক কপি করে ফলাফল দিয়ে আসেন। সেগুলো যোগ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সব কেন্দ্রের ফলাফল অনুযায়ী ১ হাজার ৪১৮ ভোটে নৌকা জিতেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা যে তিনটি কেন্দ্রের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেন, তাতেও দেখা যায় নৌকা এগিয়ে। তবে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার পর বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজন নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করে। এরপর হঠাৎ করেই ফল ঘোষণা বন্ধ হয়ে যায়। তবে সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেন। তাতে দেখা যায়, নৌকা ৫ হাজার ৮৫৫ আর বিদ্রোহী প্রার্থীর নারকেলগাছ ৪ হাজার ৯৩৬ ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ ৯১৯ ভোটে জয়ী হয়েছে নৌকা।
নড়িয়ার পৌর নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা ছিল শুরু থেকেই। ২৭ বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং বর্তমান মেয়র হায়দার আলী এবারের পৌরসভা নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তিনি স্থানীয় সাংসদ ও সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। নড়িয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ইসমাইল হক তাঁর বিরোধিতা করে বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল ইসলামকে সমর্থন দিলে শুরু হয় উত্তেজনা। হামলা ও মামলার কারণে নৌকার প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। হায়দার আলীই ছিলেন সারা দেশে একমাত্র প্রার্থী, যিনি মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের হামলা-মামলায় বিপর্যস্ত ছিলেন।
সাধারণ ভোটার, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতেই উপজেলা চেয়ারম্যান ইসমাইল হক বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল ইসলামের নারকেলগাছের প্রতীকে কাজ করার জন্য বলে আসেন। কয়েকটি কেন্দ্রে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে টাকাও নিয়ে যান বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
গতকাল নড়িয়ায় গিয়ে জানা যায়, পৌর এলাকার ভোটার না হয়েও উপজেলা চেয়ারম্যান মোটরসাইকেলের পেছনে বসে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন এবং ভোটারদের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য বলছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা নির্বাচন কর্মকর্তারা তাঁকে আটকাতে পারেননি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একের পর এক কেন্দ্র হয়ে সকাল ১০টার দিকে ২ নম্বর ওয়ার্ডের নড়িয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের ভেতরে আসেন ইসমাইল হক। এ সময় সেখানে দায়িত্ব পালন করা জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শহিদুল ইসলাম তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। বিচারিক হাকিম সেই মুহূর্তে তাঁকে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। এরপর তিনি কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যান।
কেন্দ্রে ঘোরাঘুরির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসমাইল হক পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কারা?’ সাংবাদিক পরিচয় শুনে তিনি বলেন, ‘আমিও তো সাংবাদিক। এশিয়ান ডট কম অনলাইনের।’
২ নম্বর কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে ইসমাইল হক ১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রেমতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে যান। তবে বিচারিক হাকিমের গাড়ি সেখানে এলে তিনি মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান। এরপর বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বিচারিক হাকিম ও নির্বাহী হাকিমেরা এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে ছুটছেন। যখনই কোথাও কোনো অনিয়ম হচ্ছে, তাঁরা ছুটে যাচ্ছেন। তবে যখনই কোনো কেন্দ্রে বিচারিক বা নির্বাহী হাকিমেরা থাকছেন না, তখনই বহিরাগত ব্যক্তিরা কেন্দ্রের ভেতর ঢুকছেন। অনেককে প্রকাশ্যে সিল মারতেও দেখা গেছে। তবে কোথাও কোনো সহিংসতা হয়নি।
সকাল নয়টার দিকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম লোনসিং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, মাঠভর্তি নারী ও পুরুষ ভোটার। ভোটের লাইনে দাঁড়ানো চম্পা বেগম বলেন, অনেক দিন পর ভোট নিয়ে এলাকার সবার মধ্যে উৎসব উৎসব ভাব।
নড়িয়ার ১ নম্বর কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন সাংসদ শওকত আলী। নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সার্বিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ। কিন্তু পৌর এলাকার ভোটার না হওয়া সত্ত্বেও উপজেলা চেয়ারম্যান ইসমাইল হক এখানকার বিদ্রোহী প্রার্থীকে জয়ী করতে বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে ভোটার ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের হুমকি দিচ্ছেন।’
নড়িয়া পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তা শেখ মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচনের আগে অনেক উত্তাপ থাকলেও শেষ পর্যন্ত এ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ভোট গ্রহণের হারও ৭০ শতাংশের বেশি। নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন হায়দার আলী।’



