শরিফুল হাসান
প্রকল্পের সময় প্রায় শেষ৷ ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে ৭০ কোটি টাকা। কিন্তু পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মেয়াদ শেষের মাত্র এক মাস আগে প্রকল্পের সঠিকতা যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়৷ এই প্রেক্ষাপটেই আবার সাত কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষে নতুন আরেকটি পর্যায় অনুমোদনের তদবির করা হচ্ছে৷
২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে শিশুকর্মীদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যাহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ৷ এ লক্ষ্যের বাস্তবায়নে সাড়ে তিন বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন (তৃতীয় পর্যায়) শীর্ষক ওই প্রকল্প হাতে নেয় সরকার৷
২০১১ সালের জুনে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহী এনজিওর কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়৷ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুরুতেই এনজিও নিয়োগে সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে৷ প্রকল্প পরিচালক ম আ কাশেম মাসুদের বিরুদ্ধেও রয়েছে অনিয়মের অনেক অভিযোগ৷
গত ১৪ মে শ্রম মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় বলা হয়, ইতিমধ্যে প্রকল্পের তিন বছর চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। জুন মাসেই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা৷ মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে অনিয়ম পাওয়ায় কেন্দ্র ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাসহ সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে৷
শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক নিজেও এই প্রকল্প নিয়ে অসন্তুষ্ট৷ তিনি প্রথম আলোকে বলেন, È‘আমি সরেজমিনে অনেক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাইনি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি৷ প্রকল্পটি নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। তাই বলে দিয়েছি, এর মেয়াদ আর বাড়বে না।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, বিষয়টি তদন্ত করার জন্য প্রধান কলকারখানা পরিদর্শককে দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে৷ কমিটি প্রতিবেদন দিলে তাঁরা ব্যবস্থা নেবেন৷
গোড়াতেই গলদ: আবেদন করা ৬১৯টি এনজিও থেকে ১০৬টিকে নির্বাচন করা হয়। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, এনজিওগুলোর বেশির ভাগই ঠিক করেন মন্নুজান সুফিয়ান। এ ছাড়া অন্তত পঁাচটি এনজিও প্রকল্প পরিচালকের আত্মীয়ের৷ অভিযোগ রয়েছে, মন্নুজান সুফিয়ানের ভাই শাহাবুদ্দিন, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ইসহাক বাবু ও প্রকল্প পরিচালক কাশেম মাসুদ টাকার বিনিময়ে এনজিও বাছাই করেন।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন৷ সর্বশেষ গত সপ্তাহে তিনি ও তাঁর ভাই উভয়ে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সব যোগ্যতা দেখেই এনজিও নির্বাচন করা হয়েছিল৷ তাঁরা যখন দায়িত্বে ছিলেন, তখন কার্যক্রম তদারক করেছেন৷
সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরে তথ্য অধিকার আইনে এই প্রকল্পের কাজ পাওয়া এনজিওগুলো সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়৷ অধিদপ্তর মাত্র ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য দিতে পেরেছে৷ এর মধ্যে ১৮টির সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনই ছিল না। শর্ত অনুযায়ী অভিজ্ঞতাও অধিকাংশ এনজিওর নেই৷
কেন্দ্র ও শিশুদের খুঁজে পাওয়া ভার: প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত শিশুদের উপানুষ্ঠানিক ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং বৃত্তি দেওয়ার কথা৷ ১৪টি জেলায় এক হাজার ৬৬৭টি কেন্দ্রে ৫০ হাজার শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার কথা এর মাধ্যমে৷ প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ঢাকা, খুলনা, যশোর ও চট্টগ্রামে সরেজমিনে অনেক এনজিওর কোনো কার্যক্রম খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি ঢাকার কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক ম আ কাশেম মাসুদ চারজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। লালবাগ-সূত্রাপুর এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিদরাতুল মুনতাহা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানান, ওই এলাকায় পল্লীবাংলা মহিলা সংস্থা নামের একটি এনজিও কাজ করছে। তবে সেখানে এনজিওটির পরিচালিত কেন্দ্রগুলোর তথ্য তিনি দিতে পারেননি। সেদিনই পরে আবার কথা হলে জানান, তিনি আর ওই প্রকল্পের কাজ দেখাশোনা করছেন না৷ এ প্রতিবেদক এক সপ্তাহ ধরে খোঁজখবর নিয়ে যশোরের ঠিকানার ওই এনজিওটির হদিস পাননি৷
তেজগাঁও এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গুল নাহার জানান, ওই এলাকায় ৪৪টি কেন্দ্র পরিচালনা করছে উদয়ন বাংলাদেশ ও ফেইথ। উদয়নের নির্বাহী পরিচালক শেখ আসাদ একটি কেন্দ্রের ঠিকানাও দিতে পারেননি। শুধু প্রকল্প কর্মকর্তা দেওয়ান জেরিন সুলতানা বাড্ডা ও সবুজবাগ এলাকায় কাজ করা চারটি এনজিওর সব কটি কেন্দ্রের ঠিকানা দিতে সক্ষম হন। ২৬ মে রায়েরবাগে মিশন ইন ডেভেলপমেন্ট এনজিওর ১৫টি কেন্দ্রের সন্ধানে গিয়ে চারটি পাওয়া গেলেও কোনো শিশুকে পাওয়া যায়নি। প্রেমতলা সাদেক খান রোডের কেন্দ্রটি তালাবদ্ধ ছিল৷ পাশের রিকশা গ্যারেজের এক কর্মী জানান, মাঝেমধ্যে তালা খোলা হয়। চার-পাঁচিট শিশুকে তাঁরা দেখেছেন।
চট্টগ্রামে কাজ করা ২০টি সংগঠনের মাত্র একটির সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন আছে৷ নগরের পাথরঘাটা ব্রিক ফিল্ড রোডের পাশের বস্তিতে কয়েকটি স্কুলে কার্যক্রম থাকার কথা থাকলেও সম্প্রতি গিয়ে সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি৷ সহকারী প্রকল্প পরিচালক সঞ্জয় কুমার বর্মণ এ বিষয়ে জানান, কিছুদিন আগে আগুন লেগে পুড়ে যাওয়ায় ঠিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে৷ বায়েজীদের আলীনগর এলাকায় বিকেল চারটায় একটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, েকানো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নেই৷ ফোনে প্রশিক্ষক আনোয়ারা বেগম বলেন, স্কুল চারটায় শেষ হয়ে যায়৷ যদিও সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা বলেছেন, সে এলাকায় সকাল নয়টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত স্কুল চলে৷
খুলনায় বাছাইতে বাদ পড়া ১৮টি এনজিওকে অবৈধভাবে এ প্রকল্পে যুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ করেছে নির্বাচিত ছয়টি এনজিও৷ নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকটি এনজিওর শীর্ষ কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, মন্নুজান সুফিয়ান ও তঁার ভাই শাহাবুদ্দিন চাপ দিয়ে বাদ পড়া ১৮টি এনজিওকে প্রকল্পে সম্পৃক্ত করেছেন।
নগরের নতুন বাজার চর এলাকায় মায়ের আঁচল পরিচালিত একটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আট-নয়জন শিক্ষার্থী দরজির কাজ শিখছে। স্কুলে যায় কি না, জানতে চাইলে সবাই জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে থাকে৷ পরে একজন বলে, ‘আমরা কোনো স্কুলে যাই না, এখান থেকে বাড়িতে গিয়ে মায়ের কাজে সাহায্য করি।’
রূপসা এলাকার একটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দরজায় তালা ঝুলছে। চানমারী এলাকায় ছায়াকুঞ্জের একটি কেন্দ্র খোলা পেলেও শিক্ষার্থী বা কর্তৃপক্ষের কেউ ছিল না৷
বাদ পড়া এনজিও অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে খুলনার দায়িত্বে থাকা প্রোগ্রাম সুপারভাইজার মো. আরাফাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাপে পড়ে করতে হয়েছে, বাধ্য হয়ে অনেক কিছু করতে হয়।’
পরিচালকের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ: প্রকল্পের পরিচালক ম আ কাশেম কাজ দিতে ২০টি এনজিওর কাছ থেকে পঁাচ লাখ টাকা করে নিয়েছেন বলে মন্ত্রণালয় ও দুদকে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ, তিনি বিনা মূল্যের বই দিয়ে এনজিওগুলোর কাছ থেকে এক কোটি ৩৩ লাখ টাকা নিয়েছেন। প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, গাড়ি কেনার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে বিনা সুদে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিলেও তিনি সার্বক্ষণিক ব্যবহার করেছেন প্রকল্পেরই একটি গাড়ি (ঢাকা-মেট্রো চ-৫৩-৫৪২৭)৷ মাসে এই গাড়ির জ্বালানি বাবদ তিনি ৩০ হাজার টাকা নেন। ফটোকপি সরবরাহকারী বাবু মিয়া অভিযোগ করেছেন, ঘুষ না দেওয়ায় তঁার দুই লাখ ৬০ হাজার টাকার বিল আটকে দেওয়া হয়েছে। রুটস নামে একটি এনজিওর কুষ্টিয়ার স্থায়ী ঠিকানায় কাউকে পাওয়া যায়নি। রুটসের নির্বাহী পরিচালক মোসলেম উদ্দিন নিজের পরিচয় দিয়েছেন কাশেম মাসুদের ভাই বলে৷
ম আ কাশেম মাসুদ প্রথম আলোকে জানান, তঁার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো ষড়যন্ত্র৷ এনজিও রুটসের মোসলেম তঁার ভাই নন। বিনা মূল্যে বিতরণের বই দিয়ে এনজিওর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।


