দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার শিশুদের জন্য এবার স্কুল খাদ্য কর্মসূচি

Spread the love

শরিফুল হাসান


নদীর তীরে স্কুল। সামনে উড়ছে লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা। চারদিকে সবুজ গাছগাছালি। বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি মেঠোপথ। একদম নদী অবধি। নদীর ওপারে সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত গোটা গ্রাম। এর তীরে ভেড়ানো একটি পালতোলা নৌকা। নৌকা থেকে খাদ্যসামগ্রী শ্রমিকদের মাথায় বোঝাই হয়ে আসছে বিদ্যালয়ে।ঠিক এ রকম একটি ছবি এঁকে আন্তর্জাতিক শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতেছে বাংলাদেশের মুহিব্বা তানজুম। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় ইতালিতে এ বছর এই চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। তানজুম গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শোলাগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় এই স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্কুট বিতরণের কাজ চলছে। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফও) সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ২০০১ সাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শুরু করে। এই কর্মসূচির সফলতা দেখে সরকার এবার ‘দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার জন্য ‘স্কুল ফিডিং কর্মসূচি’ নামে আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। উদ্দেশ্য, সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।আগের কর্মসূচির সাফল্য: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, কিশোরগঞ্জ ও তিন পাবর্ত্য জেলার চার হাজার ২৯৪টি স্কুলের ছয় লাখ শিক্ষার্থী স্কুল খাদ্য কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে। এ ছাড়া সিডরবিধ্বস্ত এলাকার পাঁচটি জেলা—পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, বাগেরহাট ও বরিশালে এই কর্মসূচি চলছে। সব মিলিয়ে সাত হাজার স্কুলের ১০ লাখ শিশু স্কুল খাদ্য কর্মসূচির আওতাভুক্ত। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।ডব্লিউএফপির বাংলাদেশের কর্মকর্তা এম. ইমামুল হক জানান, স্কুল খাদ্য কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন জনপ্রতি আটটি বা ৭৫ গ্রাম বিস্কুট বিতরণ করা হয়ে থাকে। এই বিস্কুট একটি শিশুকে দৈনন্দিন ৩৩৮ কিলোক্যালরি শক্তি এবং প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ভিটামিনের ৬৭ ভাগ জোগান দিয়ে থাকে। তিনি জানান, এই কর্মসূচির ফলে শিশুদের স্কুলে আসার হার বেড়েছে। বাংলাদেশে এই কর্মসূচি পুরোপুরি সফল বলে মনে করেন তিনি।বাংলাদেশে ডব্লিউএফপির প্রতিনিধি জন আইলিয়েফ জানান, এই বিস্কুট শিশুদের কতটা কাজে আসছে, সেটা জানার জন্য ইন্টারন্যাশনাল ফুড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরই) ও টাফট ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে একটি জরিপ চালায়। জরিপে দেখা গেছে, যেসব স্কুলে এই কর্মসূচি চলছে, সেসবে মোট ভর্তির হার বেড়েছে শতকরা ১৬ ভাগ, হাজিরা বেড়েছে ১৪ ভাগ, ঝরে পড়া কমেছে ১০ ভাগ, ফল ভালো হয়েছে ১৬ ভাগ, রক্তশূন্যতা কমেছে পাঁচ গুণ। কাজেই একটি বিষয় পরিষ্কার যে এই কর্মসূচি আসলেই সফল।জন আইলিয়েফ বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় একটি দেশে দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না কিংবা গেলেও ঝরে পড়ে। বিষয়টি দুঃখজনক। এ কারণে ডব্লিউএফপি স্কুল খাদ্য কর্মসূচি শুরু করে। বিশ্বের ৭১টি দেশে স্কুল খাদ্য কর্মসূচি চলছে। বাংলাদেশে এর সাফল্য দেখে আমরা অনুপ্রাণিত।’প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) বাবলু কুমার সাহা জানান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় যে বিস্কুট বিতরণ কর্মসূচি চলেছে, সত্যিকার অর্থেই তা শিশুদের স্কুলমুখী করেছে। এখন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদেরও সংখ্যা কমেছে। দরিদ্র এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার এখন অনেক বেশি। এই বিস্কুট তাদের পুষ্টিও বাড়াচ্ছে।মাঠপর্যায়ের চিত্র: যেসব স্কুলে খাদ্য কর্মসূচি চলছে, সেগুলোর প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচি চালু হওয়ার ফলে ঝরে পড়া শিশুদের হার অনেক কমেছে। না খেতে পেয়ে অপুষ্টির শিকার হয়ে আগে দরিদ্র শিশুরা প্রায়ই নানা ধরনের অসুখে ভুগত। এখন আর তা হচ্ছে না।গাইবান্ধার শোলাগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহানা আক্তার বলেন, তাঁর স্কুলে ২০০৬ সালের নভেম্বর থেকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বিস্কুট বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। এই কর্মসূচি চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও উপস্থিতির হার বেড়েছে। ২০০৬ সালের আগে ছাত্রছাত্রী ছিল ৯০ জন, কিন্তু বর্তমানে তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ জন।কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোকসেদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিস্কুট দেওয়ার কারণে স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। ঝরে পড়ার হারও কমে গেছে। আগে এই হার ছিল ২০ ভাগ। এখন সেটা বড়জোর এক থেকে দুই ভাগ। কুড়িগ্রামের মতো দরিদ্র এলাকার জন্য এই কর্মসূচি খুবই ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে।কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীমা আখতার বলেন, এ বিস্কুট অপুষ্টি দূর করে। একটি শিশুর এক দিনে যে পরিমাণ ক্যালরি প্রয়োজন, বিতরণ করা বিস্কুটে তা আছে। এ ছাড়া বিস্কুটে ভিটামিন থাকায় শিশুদের মুখের ঘা কমে গেছে, আয়োডিনের অভাব দূর হয়েছে। তাদের বুদ্ধিমত্তাও বেড়েছে।কুড়িগ্রামের রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান জানান, বিস্কুট দেওয়ার ফলে শিশুরা বিদ্যালয়মুখী হয়েছে। আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের স্কুলে আনতে হতো। এখন তেমনটা করতে হয় না। গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণত অপুষ্টিতে ভোগে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূিচর আওতায় অপুষ্টি দূর করতে জেলার সাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৬০৮টি সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচি চালু হওয়ায় ওই সব বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতির হার বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচি চালু করা হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার যেমন বাড়বে, তেমনি তাদের মানসিক বিকাশেও তা সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।ঢাকা মহানগরের ৩৬৪টি বিদ্যালয়ে স্কুল খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে বেসরকারি সংগঠন ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। এই কর্মসূচির মাঠ পরিদর্শক কামাল হোসেন বলেন, এর মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে ৭৫ হাজার ৩৫৮ জন শিক্ষার্থী। তাদের ঝরে পড়ার হার কমেছে, বেড়েছে উপস্থিতির হার।প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী (এমডিজি) ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বর্তমান সরকার ২০১১ সালের মধ্যে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে।প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) বাবলু কুমার সাহা প্রথম আলোকে জানান, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন করতে হলে সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু শহরভুক্ত এলাকার প্রায় সব শিশু স্কুলে গেলেও দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার শিশুরা নানা কারণে স্কুলে যেতে পারে না। তাদের স্কুলে না আনতে পারলে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণেই দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার সব শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আর ডব্লিউএফপির উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় যে বিস্কুট বিতরণ কর্মসূচি চলছে, তার সফলতা সরকারকে অনুপ্রাণিত করেছে।সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনই লক্ষ্য: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচির নামে যে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্যই দরিদ্র শিশুদের স্কুলে আনা। এ কারণেই দেশের ছয়টি বিভাগের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাকবলিত এলাকা রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, সিডর ও আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, বাগেরহাট ও বরিশালের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া দেশের সব কটি বিভাগের দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামগুলোর স্কুল এই প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হবে।ডব্লিউএফপির বাংলাদেশের কর্মকর্তা এম. ইমামুল হক জানান, ‘স্কুল খাদ্য কর্মসূচির সফলতা দেখেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। আমরাও মনে করি, এর মাধ্যমে সত্যিকারভাবে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রকল্পে মোট খরচ হবে ৯৬৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে এই কাজ পরিচালিত হবে। নীতিগতভাবে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন হবে। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এ কর্মসূচির সূচনা হবে বলে আশা করছেন তাঁরা। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে। এর আওতায় ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৪৯ জন প্রাথমিক শিশুর শারীরিক পুষ্টির মান বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা অফিস।

Leave a Reply

Your email address will not be published.