ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মৃত্যুর পর ‘ক্ষতিপূরণ’ দিয়েছে জামায়াত
শরিফুল হাসান

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সিরাজগঞ্জে যে ১১ জন মারা গেছে, তাদের মধ্যে সাতজনই শিশু-কিশোর। নিহত অন্তত পাঁচজনের পরিবারকে জামায়াত ‘ক্ষতিপূরণ’ দিয়েছে। তবে জামায়াত একে সহায়তা বলছে।
পুলিশ বলছে, এখানে অবরোধকারীরা শিশু-কিশোরদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। পিকেটিং, রাস্তা অবরোধ, ককটেল নিক্ষেপ, প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলা, এমনকি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময়ও তাদের সামনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে গরিব শিশু-কিশোর বা টোকাইদের টাকা দিয়ে এ কাজে জড়ানো হচ্ছে। পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শের কারণেও কেউ কেউ আসছে। অনেক সময় গ্রামের লোকজনের কথায় বা খেলাচ্ছলে শিশু-কিশোরেরা পিকেটিংয়ে চলে আসছে।
গত কয়েক দিনে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চণ্ডীদাসগাতী, বহুলী ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে লাঠি হাতে শিশুদের রাজপথে পিকেটিং করতে দেখা গেছে। পুলিশ ও এলাকাবাসী জানিয়েছে, চণ্ডীদাসগাতী ও বহুলী ছাড়াও সিরাজগঞ্জ-কাজীপুর সড়কের খোকসাবাড়ী, কাঠেরপুল, সমাজকল্যাণ মোড়, বেলকুচি উপজেলার কল্যাণপুর, মবুপুর ও সর্বতুলসী এবং উল্লাপাড়া উপজেলার শ্রীকোলা মোড়, পূর্ণিমাগাতী—এসব এলাকা জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি। এসব স্থানে সব সময়ই পিকেটিংয়ের সামনের সারিতে রাখা হয় শিশু-কিশোরদের।
গত ২৯ মার্চ আটক জামায়াতের নেতাকে ছিনিয়ে নিতে মাইকে ঘোষণা দিয়ে বেলকুচির ধুকুরিয়াবেড়া ইউনিয়নের কান্দাপাড়া বাজারে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালান। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ফরিদুল ইসলাম (১৮) ও ইউনুস আলী মারা (১৫) যায়।
ইউনুস দৌলতপুর হাইস্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। তার বাবা আবদুল হামিদ বাজারে ছোট্ট একটি দোকান চালান। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা স্কুলে পড়ত আর দোকানে আমার সঙ্গে কাজ করত। সেদিনও আমার সঙ্গে বাজারের দোকানে ছিল। হঠাৎ করে মিছিল বের হয়। মিছিলকারীরা ছেলেটাকেও ডেকে নিয়ে যায়। এরপর সে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।’
হামিদ জানান, ছেলের মৃত্যুর পর জামায়াত তাঁকে এককালীন ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে। এখন মাসে মাসে সাত হাজার করে টাকা দেয়।
ফরিদুল ইসলাম তাঁতশ্রমিক ছিলেন। আট বছর বয়সেই তাঁর বাবা মারা গেছেন। একমাত্র বোন প্রতিবন্ধী। ফরিদুলের মা ফরিদা বেওয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেটা কাজ করে সংসার চালাত। একই সঙ্গে মাদ্রাসায় পড়ত। এরপর জামায়াত তাকে দলে নেয়। সেদিন লোকজনের সঙ্গে ছেলেও সেখানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।’
ফরিদা বেওয়া জানান, ছেলে মারা যাওয়ার পর জামায়াত তাকে একটি বাড়ি করে দিয়েছে। এখন মাসে মাসে চার হাজার করে টাকা দেয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর হরতাল চলাকালে সদর উপজেলার চণ্ডীদাসগাতীতে পুলিশ-জামায়াত সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজাখাঁর চর গ্রামের আলমগীর হোসেনের ছেলে মোক্তার হোসেন (১৬) ও চণ্ডীদাস গ্রামের আবদুল জলিলের ছেলে রুহুল আমিন (১৫) মারা যায়। তারা দুজনেই সেদিন পিকেটিং করছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। দুজনকেই জামায়াত-শিবির নিজেদের কর্মী দাবি করেছে।
রুহুল আমিন ধুকুরিয়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের কারিগরি শাখায় পড়ত। তার বাবা দিনমজুর আবদুল জলিল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। গুলির শব্দ শুনে সেখানে গিয়ে নিজেই গুলির শিকার হয়।’
এ দুজনের পরিবারকেও জামায়াত বাড়ি করার জন্য এককালীন টাকা দিয়েছে। তবে টাকার পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাঈদীর মামলার রায়ের পর জামায়াতের ডাকা ৪৮ ঘণ্টা হরতাল চলাকালে গত ৪ মার্চ উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্ব দেলুয়া সেতুর কাছে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে উপজেলার ফলিয়া গ্রামের আজিজার রহমানের স্কুলপড়ুয়া ছেলে মাহফুজুর রহমান (১৬) মারা যায়। মাহফুজ ফলিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণীতে পড়ত। শিবির দাবি করেছে, মাহফুজ তাদের সাথি।
মাহফুজের বড় ভাই আবদুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে শিবিরের নেতাদের সখ্য ছিল। কিন্তু আমরা তাকে এই পথ থেকে সরে আসতে বলেছিলাম। সে কথা দিয়েছিল, এই পথ থেকে সরে আসবে। কিন্তু তার আগেই তাকে মরতে হয়েছে।’
মাহফুজের বাবা আজিজুল হক প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেছেন, ছেলে মারা যাওয়ার পর তাঁকে এক লাখ টাকা দিয়েছে জামায়াত। এখন মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দিচ্ছে।
হরতাল-অবরোধে কেন শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন যে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে সর্বস্তরের মানুষ যোগ দিচ্ছে। আর সে ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরেরাও সামনের সারিতে থাকছে। পুলিশ বেপরোয়াভাবে গুলি চালাচ্ছে। ফলে তারাও মারা যাচ্ছে।’ আপনারা কেন শিশু-কিশোরদের সামনে রাখছেন জানতে চাইলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘যেখানে আমাদের নেতৃবৃন্দ আছে, সেখানে আমরা তাদের রাখছি না। তবে স্বেচ্ছায় হয়তো অনেকেই আসছে।’
নিহত পাঁচ শিশুর পরিবারকে ‘আর্থিক সহায়তা’ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘দলের কেউ মারা গেলে আমরা তার পাশে থাকার চেষ্টা করি। সে ক্ষেত্রে এককালীন বা অন্য কোনোভাবেও সহায়তা করা হয়। সংগঠনের স্থানীয় শাখাগুলোই এ কাজ করে থাকে।’
এর বাইরে ৯ ডিসেম্বর সদর উপজেলার বহুলী বাজারে পুলিশ ও জামায়াতের কর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে বহুলী মধ্যপাড়া গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ১২ বছরের ছেলে সুমন সরকার (১২) গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।
জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা তদন্ত করে জেনেছেন, ছাব্বিশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর অভাব-অনটনের কারণে এ বছরই স্কুল ছেড়ে দেয় সুমন। এরপর দৈনিক ১০০ টাকায় একটি চিপস কারখানায় কাজ নেয় সে। মিছিলে গেলে অতিরিক্ত টাকা পাবে—এমন প্রলোভন দেখিয়েই তাকে নেওয়া হয়েছিল।
তবে সুমনের দিনমজুর বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ছেলে সেদিন চুল কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে অবরোধকারী ও পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে মারা যায়। সে কোনো রাজনীতির সঙ্গে ছিল না।’
গত ২৭ নভেম্বর বেলকুচি উপজেলার মুকুন্দগাতী বাজারে একটি মিছিল বের করে বিএনপি-জামায়াত। পুলিশ বাধা দিলে মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে একাধিক ককটেল হামলা চালানো হয়। পরে আওয়ামী লীগের কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে যোগ দিলে বড় সংঘর্ষ হয়। এ সময় দৌলতপুর হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র মাসুম বিল্লাহ প্রাণ হারায়।
মাসুম বিল্লাহর চাচা গোলাম মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছয় মাস আগে মাসুম লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। সে ছাত্রদল করত। কর্মসূচির অংশ নিতেই সে মিছিলে গিয়েছিল।’
সিরাজগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার এস এম এমরান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হরতাল-অবরোধে সিরাজগঞ্জের যত জায়গায় পিকেটিং বা সহিংসতা হচ্ছে, সবখানে সামনে রাখা হচ্ছে শিশু-কিশোরদের। এদের অনেককে টাকা দিয়ে আনা হচ্ছে। আবার অনেকে হয়তো পরিবারের কারণে নিজেরাই আসছে। পুলিশকে বিব্রত করতে রাজনৈতিক নেতারা এখন আরও বেশি করে শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করছে।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, বিষয়টি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। অবুঝ শিশু-কিশোরদের হরতাল-অবরোধে সামনের সারিতে রাখা হচ্ছে। শিশুরা বোঝে না বলেই হয়তো আসছে। কিন্তু যারা তাদের আনছে, তাদের উচিত এ চর্চা বন্ধ করা।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে এক বৈঠকে আমরা সব স্কুলের শিক্ষকদের এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বলেছি। আর বাবা-মায়েদেরও ছোট্ট সন্তানদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’



