শরিফুল হাসান
প্রায় তিন লাখ ছেলেমেয়ের জিপিএ–৫ পাওয়া, ১০০ তে ৯৮, ৯৯,১০০ পাওয়া, এমনকি বাংলাতেও ২০০ এর মধ্যে ২০০ পাওয়া, ফেসবুকে অভিভাবকদের নম্বর শেয়ার করা, এগুলোর কোনটাই আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় না। বরং অস্বাভাবিক লাগে।
যশোরের একজনের স্ট্যাটাস দেখলাম অর্ধেক প্রশ্নের উত্তর না দিয়েও এ প্লাস পেয়েছে। কোন বিষয়ের পরীক্ষা দিয়ে কান্নাকাটি করে সেই বিষয়ে এ প্লাস পাওয়ার ঘটনা তো গণহারে ঘটেছে বলে শুনছি। এমন ঘটনা নিশ্চয়ই সারা দেশে আছে।
আছে আরো অদ্ভুত সব ঘটনা। মাত্র দুই দশক আগে আমাদের যে শিক্ষকরা ১০০ তে ৬০ নম্বর দিতে কৃপণতা দেখিয়েছেন এখন নাকি উদারভাবে নম্বর না দিলে তাদের সংকটে পড়তে হয়। শিক্ষার সঙ্গে জড়িত লোকজন শিক্ষার মান নিয়ে ভালো বলতে পারবেন।
একজন সাংবাদিক এবং এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে আমার পর্যবেক্ষণ হলো আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলেছি। যেহেতু একটু আধটু বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াই, অনেক নিয়োগ বোর্ডে থাকি এবং অনেক ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলি তাতে প্রায়ই মনে হয়, একদল ছেলে-মেয়ে অবশ্যই মোটামুটি ভালো যাদের একটা বড় অংশ পরে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে নানা কারণে কিন্তু মোটাদাগে আমাদের শিক্ষার দৈন্যদশা।
একটা পরীক্ষা করতে পারেন, বহুবছর ধরে তো সৃজনশীল চলছে কাজেই যে কোন একটা বিষয়ে বাংলা বা ইংরেজিতে আমাদের ছেলে-মেয়েদের লিখতে দিন। দেখবেন, মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক এমনকিবিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পাওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী ফেল। বিশ্বাস না হলে দৈবচয়ন ভিত্তিতে জিপিএ-৫ পাওয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারীদের দৈবচয়ণ ভিত্তিতে যাচাই করতে পারেন।
আমাদের ছেলেমেয়েদর ইংরেজি, বাংলা, গনিতের মান যাচাই করে দেখলে ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসবে। অথচ আমরা লাখে লাখে জিপিএ সনদ দিচ্ছি। যারা এই সনদ পাচ্ছে তারা, তাদের অভিভাবক সবাই উচ্চ প্রত্যাশায় থাকে। আসলে আমরা শুধু যে প্রতারণা করছি তাই নয় দেশকেও ধ্বংস করছি।
শুধু যে মানের সংকট তা নয়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধের ভয়াবহ সংকট। এতো এতো ভালো ফল অথচ ভালো মানুষের সংকট চারপাশে। বহুবছর ধরে বলছি, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কার দরকার। বিশেষ করে সৃজনশীলের নামে আমরা যা করেছি সেটা ভয়ঙ্কর।
আমি মনে করি লাখ লাখ সনদ দেয়ার চেয়ে কারিগরী শিক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। বাংলা মাধ্যম হোক মাদ্রাসা কিংবা অন্য কিছু অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সবার একই ধরনের সিলেবাস হওয়া উচিত। আর আমাদের শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া উচিত মূল্যবোধের ওপর। আমি আমাদের ছেলেমেয়েদের উপর দোষ দেই না।
দোষ দিয়ে আমাদের নীতি নির্ধারকদের উপর। আমি মনে করি শিক্ষা নিয়ে আমরা বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিশেষ করে সৃজনশীলের নামে আমরা যা করেছি সেটা ভয়ঙ্কর। আমাদের শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় ভয়াবহ ত্রুটি। একদিকে প্রাথমিকের শিক্ষকদের বেতন সরকারি অনেক দপ্তরের কর্মচারী বা অফিস সহকারীর চেয়েও কম। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় ভয়াবহ গলদ।
এমপিওভুক্তি, সারাদেশের কলেজগুলোতে গণহারে অনার্স চালু, এখন জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় এগুলোর কোনটাই সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হয় না। অবকাঠামোগত উন্নয়নের এই দেশে কথাগুলো লিখছি, কারণ দিনশেষে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর আমাদের সেই মেরুদণ্ডের অবস্থা খুব একটা ভালো না।
আর মেরুদণ্ড ভালো না হলে একটা জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। জানি না নীতি নির্ধারকদের বোধ জাগবে কী না, আবার তাদের সন্তানদের কতোজন এই দেশে বা বাংলা মাধ্যমে পড়ে সেটা নিয়েও গবেষণা হতে পারে। জানি না আমাদের নীতি নির্ধারকদের বোধ ভাঙবে কী না তবুও লিখছি বিবেকের তাড়নায়।
লিখছি করজোড়ে মিনতি করে, চলুন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে নিজেদের ভুল শোধরাই। জাতির মেরুদণ্ডটা ঠিক করি।



