খরচের টাকা ওঠেনি, ইরাক ছাড়তে চান না বাংলাদেশিরা

Spread the love

শরিফুল হাসান

ইরাকের তিকরিত শহরে বিদ্রোহীরা ২৪ দিন জিম্মি করে রেখেছিল চাঁদপুরের সাইফুল ইসলামকে। মুক্তি পাওয়ার পর দেশে ফেরত পাঠাতে তাঁকে ইরাকের একটি বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। কিন্তু দেশে না ফিরে বিমানবন্দর থেকেই তিনি সটকে পড়েন। কারণ যে টাকা খরচ করে তিনি গেছেন, সেই টাকা ওঠেনি। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তিনি ইরাকে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
কেবল সাইফুল নন, বিল্লাল হোসেন, সোহেল মিয়া, নূরন্নবী, মাইনুদ্দিন, মাহবুবুর রহমান, রফিক মিয়া, আবুল কালামসহ আরও ১৫ জন জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়েও একই কারণে দেশে ফেরেননি।
ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেখানে নতুন করে কর্মী পাঠানো বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি নিরাপত্তাহীনতার কারণে সেখান থেকে ফিরে এসেছেন।
ইরাকফেরত বাংলাদেশি, সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস ও ইরাক প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশটিতে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার বাংলাদেশি আছেন। ইরাকের তিকরিত, মসুল, জালুয়া, কিরকুক, বেজি ও বাগদাদের অনেক এলাকায় যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই তাঁরা আছেন। তাঁরা দেশে ফিরতে চাইছেন না। কারণ বেশির ভাগেরই খরচের টাকাই ওঠেনি।
গত শনিবার ইরাক থেকে ফিরে এসেছেন নরসিংদীর রাসেল মিয়া। গত রোববার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ৩১ জন বাংলাদেশি কাজ করতাম তিকরিতের গভর্নর হাউসে। জুন মাসে তিকরিত শহরে ঢুকে পড়ে বিদ্রোহীরা। এরপর চারপাশে গোলাগুলি। এক দিন তারা গভর্নর হাউসে ঢুকে আমাদের জিম্মি করে। অনেক কাকুতি-মিনতি করে আমরা ২৪ দিন পর ছাড়া পাই। প্রতিদিন মনে হতো এই বুঝি আমরা মারা যাব। এই ভযাবহ অবস্থা জেনেও ইরবিল বিমানবন্দর থেকে আমাদের সঙ্গে থাকা সাইফুল, বিল্লাল, সোহেল, রফিক, কালামসহ ১৬ জন পালিয়ে যান। কারণ তাঁরা সর্বস্ব বিক্রি করে ইরাকে গিয়েছিলেন। টাকা না তুলে ফিরে এসে কী করবেন।’
ইরাক থেকে ফেরা নারায়ণগঞ্জের ওয়াহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ধারদেনা করে চার লাখ টাকা দিয়ে এক বছর আগে ইরাকে যাই। মাত্র দুই লাখ টাকা তুলতে পেরেছি। অনেকে তিন-চার মাস আগে গেছেন। তাঁরা এখনো টাকা তুলতে পারেননি। এই অবস্থায় দেশে ফিরলে দেনা কোনো দিন শেষ হবে না। তাই জীবনের ঝুঁকি জেনেও তাঁরা ইরাকে রয়ে গেছেন।’
তিকরিত থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে ১৫ জন ফিরে এসেছেন তাঁদের মধ্যে দুজন বিমানবন্দর থেকে পালিয়ে গেছেন। পরে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন তাঁরা।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, এই ১৫ জন সরকারি ব্যবস্থাপনায় ফিরেছেন। এর বাইরে ১ জুলাই ইরাক থেকে ২৭ জন এবং ৮ জুলাই ৫১ জন বাংলাদেশি ফিরে আসেন। ১১ জুলাই ফিরেছেন আরও সাতজন। এ ছাড়া রোববার ফিরেছেন আরও আটজন। যুদ্ধাবস্থার কারণে নিজেদের উদ্যোগেই তাঁরা দেশে ফিরেছেন।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ২০১১ সালে বৈধভাবে মাত্র ২৩৪ জন এবং ২০১২ সালে ৩৫৯ জন বাংলাদেশি ইরাকে গেছেন। কিন্তু ২০১৩ সালে সাত হাজার ৪৫৬ জন এবং ২০১৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ছয় হাজার ৩৪ জন বাংলাদেশি ইরাকে গেছেন। নতুন যাওয়া এই বাংলাদেশিরা এখনো সে অর্থে উপার্জন করতে পারেননি।
ইরাকের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল রেজানুর রহমান খান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি সত্যি বাংলাদেশিরা দেশে ফিরতে চাইছেন না। তাঁরা খরচের টাকা তুলতে চান। তবে আমরা সবাইকে সতর্কভাবে থাকতে বলেছি।’
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ইরানের বাংলাদেশ দূতাবাসকেও আমরা সতর্ক থাকতে বলেছি। খুব সংকটে পড়লে বাংলাদেশিরা ইরান সীমান্তে চলে যেতে পারবেন। সেখান থেকে তাঁদের ফিরিয়ে আনা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.