একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা

Spread the love

বেদনার ভার বয়ে বেড়ান তাঁরা

শরিফুল হাসান


‘আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। সেদিন দুপুরে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাবা আমাকে বলে গেলেন, ঠিকমতো লেখাপড়া করো। রাতে বাসায় ফিরে আমাদের দুই ভাইয়ের পড়া ধরবেন। কিন্তু বাবা আর পড়া ধরতে এলেন না। আর কোনো দিন বাবা আমাদের পড়া ধরবেন না। বাবা আমাদের কাছে এখন কেবলই ছবি। কেবলই স্মৃতি।’ কথাগুলো বলতে বলতে কাঁদছিলেন ২০ বছরের তরুণ আশিকুজ্জামান। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স করপোরাল মাহবুবুর রশীদ ছিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত হন তিনি। ওই হামলায় নিহত রতন শিকদার, শামসুদ্দিন ও আতিক সরদারের পরিবারের সদস্যরাও এমন নানা স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। তাঁরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চান। আহত ব্যক্তিরাও ধুঁকে ধুঁকে জীবন পার করছেন। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতা-কর্মী নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হন।মাহবুবুর রশীদ: মাহবুবুরের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাবার স্মৃতি অশ্রুসিক্ত করে তুলেছে ছেলে আশিককে। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন মা শামীমা আক্তার। কিন্তু তিনিও তো কাঁদছেন। স্বামীর সঙ্গে তাঁর স্মৃতি যে আরও বেদনার। নিজেকে সামলে নিয়ে শামীমা বললেন, ‘২১ আগস্ট সকালে সুধা সদনে যান মাহবুব। দুপুরে বাসায় ফেরেন। আমি তাড়াতাড়ি দুপুরের খাবার দিই তাঁকে। ইলিশ মাছ, বেগুন ভাজি আর ডাল ছিল। মাহবুব বলল, “মাছ রাতে খাব, এখন কাঁটা বাছার সময় নেই। নেত্রীর সমাবেশ আছে। এক্ষুনি বের হতে হবে।” বেগুন ভাজা আর ডাল দিয়ে কোনোরকমে খেয়ে বেরিয়ে গেল। আর সে ফিরে এল না। মাছ খেতে গেলেও এখন আমাদের তাঁর কথা মনে পড়ে, প্রচণ্ড কষ্ট হয় তখন।’ মাহবুবের বাড়ি কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলায়। ২০০১ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার কিছুদিন পরেই শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে যোগ দেন। শামীমা বলেন, ‘যোগ দেওয়ার সময় নাকি শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এটা তো অনেক ঝুঁকির চাকরি। মাহবুব তখন বলেছিলেন, “নেত্রী সারা জীবন আপনার পাশে থাকব।” আমার স্বামী জীবন দিয়ে নেত্রীর পাশে থেকে গেলেন।’ মাহবুবের মারা যাওয়ার ঘটনা কীভাবে জানলেন—জানতে চাইলে শামীমা বলেন, ‘আমরা তখন হাজারীবাগে থাকি। সন্ধ্যার দিকে বাসার দারোয়ান আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনার স্বামী কি শেখ হাসিনার ওখানে চাকরি করেন।” আমি বলি, হ্যাঁ। দারোয়ান বলেন, “ওই খানে নাকি বোমা হামলা হইছে। অনেক মানুষ মারা গেছে।” আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। আমি দুই ছেলেকে বাসায় রেখে রিকশা নিয়ে দ্রুত সুধা সদনে (শেখ হাসিনার তখনকার বাসভবন) চলে যাই। আমি মাহবুবের খোঁজ করতে থাকি। তখন কয়েকজন আমাকে শেখ হাসিনার কাছে নিয়ে যান। আমি নেত্রীকে জিজ্ঞাসা করি, মাহবুব কোথায়? তিনি আমার কাঁধে হাত রাখেন। আমি খুব কাঁদছিলাম। নেত্রী বললেন, “ওর গুলি লেগেছে। অপারেশন হচ্ছে।” একটু পর রেহানা আপা আসেন। বাড়িতে আমি মাহবুবের সঙ্গে চাকরি করতেন এমন একজনকে দেখি। তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, মাহবুব কোথায়? তিনি কোনো কথা বললেন না। লোকজনের মধ্যে একজন আমাকে চিনতে পারেনি। তিনিই আমাকে বলেন, মাহবুব তো মারা গেছে। পরদিন রাতে লাশ পাই মাহবুবের।’ নয় বছরের আগের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শামীমার বাক রুদ্ধ হয়ে আসে। এরই মধ্যে বলেন তিনি তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা। স্বামী মারা যাওয়ার কয়েক মাস পর ঢাকার হাজারীবাগের বাসা ছেড়ে কুষ্টিয়ায় চলে যান। কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে ভর্তি করেন দুই ছেলেকে। শেখ হাসিনার দেওয়া টাকা আর সেনাবাহিনী থেকে পাওয়া রেশন দিয়ে সংসার চলত। কিন্তু গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেই রেশনও বন্ধ হয়ে যায়। অভাব-অনটন জেঁকে বসে সংসারে। কিন্তু স্বামী চাইতেন ছেলে দুটো লেখাপড়া করুক। উচ্চশিক্ষিত হোক। তাই শত কষ্টে দুই ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে নেন শামীমা। বড় ছেলে এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। ছোট ছেলে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার স্বপ্ন ইঞ্জিনিয়ার হবে। ঢাকায় লেখাপড়া করবে। তাই মাস খানেক আগে দুই ছেলে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন শামীমা। দুই সন্তানকে নিয়ে শামীমা এখন থাকেন মোহাম্মদপুরের একটি ছোট্ট বাসায়। একপর্যায়ে জানালেন, চরম অর্থকষ্টে আছেন। ট্রাস্ট (বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট) থেকে পাওয়া আট হাজার আর স্বামীর পেনশনের তিন হাজার টাকা দিয়ে চলতে হচ্ছে। শামীমা বলেন, ‘আমি যদি ৩২ নম্বরে একটা ছোট চাকরি পেতাম, তাহলে ছেলে দুটোকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারতাম।’ রতন শিকদার: নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর এলাকায় বাড়ি রতন শিকদারের। দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় তিনিও নিহত হন। রতন শিকদার যখন মারা যান, তখন তাঁর বড় ছেলে নিয়াজুল হকের বয়স ছিল আট। আর মেয়ে আমেনা জাহান স্বপ্নার বয়স মাত্র তিন। দই ছিল দুই ছেলেমেয়ের খুব প্রিয়। ব্যবসায়ী বাবা প্রায় দিনই ছেলেমেয়ের জন্য দই আর আইসক্রিম নিয়ে আসতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর স্বপ্না আর নিয়াজ দই-মিষ্টি আর খায় না। রতন শিকদারের স্ত্রী রোজি বেগম বলেন, ‘২১ আগস্ট রাত ১১টার দিকে জানতে পারি আমার স্বামী মারা গেছে। পরদিন সকালে দুই সন্তান নিয়ে আমি স্বামীর লাশ নিতে আসি।’ রোজি এখন নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থাকেন। তাঁর ভাই তাঁর বাসার খরচ দেন। রোজি বলেন, ‘আমি আমার স্বামী হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’ রতন শিকদারের মেয়ে স্বপ্না এখন যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। বাবার কথা জানতে চাইলে স্বপ্না বলে, ‘আব্বু আমার জন্য প্রায় প্রতিদিন দই নিয়ে আসতেন। আমি এখন আর দই খাই না।… আমার খুব মনে হয় আমার বাবা যদি আবার কোনোদিন দই নিয়ে আসতেন।’শামসুদ্দিন: গ্রেনেড হামলায় নিহত শামসুদ্দিনের পরিবার এখন ঢাকার খিলগাঁও থেকে খানিকটা দূরে ত্রিমোহনী এলাকায় থাকেন। শামসুদ্দিনের স্ত্রী আয়েশা বেগম আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘স্বামী মাছের ব্যবসা করত আর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করত। তিনি মারা যাওয়ার পর চার ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে আমি আছি মহাকষ্টে। এক ছেলে দরজি, এক ছেলে গ্রিলের কাজ করে, দুই ছেলে বেকার। কেউ এখন আর আমাদের খোঁজ নেয় না।’ আতিক সরদার: যাত্রাবাড়ী যুবলীগের নিহত নেতা আতিক সরদারের পরিবারও চরম অর্থকষ্টে আছে। আতিক মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী ছোট ছোট চার সন্তান নিয়ে চাঁদপুরের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। আতিকের চাচা যুবলীগের কর্মী ইকবাল হোসেন বলেন, আতিকের মেয়েটা এসএসসি পাস করেছে। বাকি তিনজনই স্কুলে পড়ে। কেউ তাদের খোঁজ নেয় না। গ্রামের মানুষ যে যেভাবে পারে তাদের সাহায্য করছে। আহত নিহার রঞ্জন কর: কেবল এই চারটি পরিবারই নয়, নিহত ব্যক্তিদের সবার পরিবারই নয় বছর ধরে দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছে। ২৪ জন নিহত হওয়া ছাড়াও সেদিন প্রায় ৩০০ কমবেশি আহত হন। তাদেরই একজন নিহার রঞ্জন কর। গ্রেনেড হামলায় তাঁর ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিহার রঞ্জন বর্তমানে সুধা সদনের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন। গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সেদিন আমরা ১৪ জন নেত্রীর আশপাশে মঞ্চের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলাম। হঠাৎ করেই বিকট আওয়াজসহ বিস্ফোরণ। চারদিকে ধোঁয়া। আমি প্রচণ্ড ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে যাই। আমাকে নাকি ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়েছিল। এরপর পঙ্গু হাসপাতালে। ডাক্তাররা বলেছিলেন, আমার ডান পা কেটে ফেলতে হবে। এরপর আমাকে ভারতে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।’ নিহার রঞ্জন বলেন, ‘বেঁঁচে আছি সত্য। হাঁটতে গেলে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। কোনো সভ্য দেশে এমন ঘটনা ঘটে কি না, আমার জানা নেই। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.