ইফতার

Spread the love

সর্বত্র বাহারি ইফতারির পসরা

শরিফুল হাসান

রাজধানীর চকবাজারে বাহারি ইফতারি সাজিয়ে বসেছিলেন দোকানিরা। দুপুরে বৃষ্টি শুরু হলে ইফতারিগুলো রক্ষা করতে তাঁরা তড়িঘড়ি করে পলিথিন টানিয়ে নেন l ছবি: প্রথম আলো
রাজধানীর চকবাজারে বাহারি ইফতারি সাজিয়ে বসেছিলেন দোকানিরা। দুপুরে বৃষ্টি শুরু হলে ইফতারিগুলো রক্ষা করতে তাঁরা তড়িঘড়ি করে পলিথিন টানিয়ে নেন l ছবি: প্রথম আলো

দুপুর থেকে হালকা বৃষ্টি। চলেছে বিকেল পর্যন্ত। রাস্তাঘাটে কাদা। কিন্তু তাতে কী? বাহারি সব ইফতারি, হাজারো মানুষের হইচই, আর কেনাবেচায় রোজার প্রথম দিনেই গতকাল মঙ্গলবার জমে উঠেছিল পুরান ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতারির বাজার।
অবশ্য কেবল চকবাজারই নয়, রাজধানীর বেইলি রোড থেকে শুরু করে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, নতুন ঢাকা, পুরান ঢাকা, উত্তর ঢাকা, দক্ষিণ ঢাকা—সর্বত্রই গতকাল ইফতারি কেনাবেচা হয়েছে। পাড়ার মোড় থেকে শুরু করে রাস্তার দুই পাশের রেস্তোরাঁ, ছালাদিয়া হোটেল থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেল—সর্বত্রই বাহারি সব ইফতারির পসরা ছিল। তবে বৃষ্টির কারণে অনেক জায়গায় কেনাবেচা কম হয়েছে।
গতকাল বেলা তিনটার পর চকবাজারে গিয়ে দেখা যায়, শাহি মসজিদের সামনের রাস্তায় বসেছে সারি সারি দোকান। সেখান দিয়ে হাঁটাই কষ্টকর। বৃষ্টির কারণে শামিয়ানা টাঙিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। কী নেই সেখানে? ঐতিহ্যবাহী বড় বাপের পোলায় খায়, খাসির রান, গোটা মুরগি ফ্রাই, মুরগি ভাজা, কোয়েল পাখি, নানা ধরনের শাহি পরোটা, সুতি কাবাব, শাশলিক, শাহি জিলাপি, দইবড়া, হালিম, বোরহানি, মাঠা, লাবাং, ফালুদা, নানা ধরনের ফল; আরও কত কী। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছাত্র, চাকরিজীবী—নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আসছে ইফতারি কিনতে।
চকবাজারের ইফতারির মধ্যে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ শত বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি খাবার। বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়, ধনী-গরিব সবায় খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়—এই ছড়ার মাধ্যমেই এই ইফতারি বিক্রি হচ্ছে বহুদিন ধরে।
৬০ বছরের বৃদ্ধ মোহাম্মদ সেকেন্দার জানালেন, তাঁরা দাদা, এরপরে বাবা এই খাবার বিক্রি করতেন। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে থেকে আজ পর্যন্ত তিনি এটা বিক্রি অব্যাহত রেখেছেন। কী কী লাগে এটা তৈরি করতে? জানালেন গরু, মুরগি, খাসি, কিমা, কলিজা, কাবাব থেকে শুরু করে ১২ ধরনের মাংস আর ১২ ধরনের মসলা। প্রতি কেজি বড় বাপের পোলায় খায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাসির লেগ, কোয়েল পাখি, ফ্রাই মুরগি, চিকেন শাশলিকসহ নানা ধরনের মাংসের আইটেম বিক্রি করছিলেন মোহাম্মদ রফিক। তিনি জানালেন, জোহরের নামাজের পর থেকেই বেচাকেনা শুরু হয়। চলে ইফতারের আগ পর্যন্ত। কোনটি বেশি জনপ্রিয়—জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর দোকানের সুতি কাবাব বেশ চলে। প্রতি কেজি ৭০০ টাকা।
মোহাম্মদপুর থেকে চকবাজারে ইফতারি কিনতে এসেছিলেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আরমান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রতিবছরের প্রথম রোজায় তিনি চকবাজার থেকে ইফতারি কেনেন। রায়হান, কিশোর, রাসেলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের একদল ছাত্রও এসেছিলেন ইফতারি কিনতে। তাঁরা বললেন, চকবাজারের গল্প এত শুনেছেন যে প্রথম রোজাতেই চলে এসেছেন। তবে যেভাবে বিক্রি হচ্ছে, সেই পরিবেশ মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
এর ব্যতিক্রম নাটকপাড়া হিসেবে পরিচিত রাজধানীর বেইলি রোডে। এখানে খোলা পরিবেশের চেয়ে দোকানগুলোতেই বেশি ইফতারি বিক্রি হচ্ছে।
গতকাল বিকেলে ক্যাপিটালে গিয়ে দেখা গেল, গ্রিল, রেশমি কাবাব, মাটন শিক, সুতি কাবাব, কিমা, তেহারি, হালুয়া, জর্দা থেকে শুরু করে ১০০ পদের ইফতারি বিক্রি হচ্ছে। ক্যাপিটালের মালিক জালালউদ্দিন জানালেন, পুরান ঢাকার অভিজ্ঞ বাবুর্চিসহ ৬০ জন লোক সকাল থেকে ইফতারি বানাতে শুরু করেন। এরপর বিকেল থেকে শুরু হয় বিক্রি।
বেইলি রোড থেকে বেরিয়ে শান্তিনগর, মগবাজার, বাংলামোটর, পান্থপথ হয়ে ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে দেখা গেল প্রতি মোড়ে বেগুনি, পেঁয়াজু, টিক্কা কাবাব, ডিমের চপ, আলুর চপ, জিলাপি বিক্রি হচ্ছে। সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজারে ফেরার পথে চোখে পড়ল যানজটে আটকা পড়া গাড়ির সারি। আজান হতেই অনেকে নেমে আশপাশের দোকানে ইফতার করলেন। সব মিলিয়ে নগরজুড়ে তখন ইফতারের আনন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.