নিজেদের ‘নির্বাচিত’ ভাবছেন আ.লীগের প্রার্থীরা
শরিফুল হাসান
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ধাপে বরিশালে আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা নিজেদের ‘নির্বাচিত’ ভাবতে শুরু করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের ভীতি প্রদর্শন এবং হয়রানি করতে পুলিশ ও প্রশাসনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। এতে চাপে আছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
২২ মার্চ বরিশালের ১০টি উপজেলার ৭৪ ইউপিতে ভোট নেওয়া হবে। এই নির্বাচনে দায়িত্ব পাওয়া ৩৫ জন রিটার্নিং কর্মকর্তার মধ্যে গত চার দিনে কথা হয়েছে ১০ জনের সঙ্গে। পাশাপাশি কয়েকজন প্রার্থী, স্থানীয় লোকজন, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রিটার্নিং কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কেউ কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য বলছে না। বরং ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা থেকে আমরা বুঝে নিচ্ছি—অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করতে হবে। আমরা এখন উত্সাহের বদলে আতঙ্ক নিয়ে দায়িত্ব পালন করছি।’
আরেকজন রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, পৌর নির্বাচনের সময় দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের কেউ কোনো ঝামেলায় যেতে চান না। এ অবস্থায় রিটার্নিং কর্মকর্তারা আর কী করবেন?
জানতে চাইলে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল হালিম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কর্মকর্তারা সবাই যেন ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন সে জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। সবাইকে মানসিকভাবে উত্সাহ দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, সবার সহযোগিতা পেলে একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করা সম্ভব।’
বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চান অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশ ও প্রশাসন সব সময় সরকারি দলের প্রার্থীকে জয়ী করতে ব্যস্ত থাকে। ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত লোকজন নিজেদের চেয়ারম্যান ভাবতে শুরু করেছেন। অনেক জায়গায় আমাদের প্রার্থী ও কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। নির্বাচনের দিন কী হবে তা নিয়ে আমরা ভয়ে আছি। তবে আমরা মাঠে থাকব।’
আওয়ামী লীগের অন্তত ১০ জন বিদ্রোহী প্রার্থীও দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দাপট দেখানোর অভিযোগ করেছেন। বানারীপাড়ার বাইশারি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তিনজন নেতা বলেন, এখানে দলের ১৮ জন সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বিএনপি থেকে আসা মাইনুল হাসানকে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা মাঠপর্যায়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
বাইশারি ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি তাজেম আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কয়েকজন কর্মীকে মারধর করা হয়েছে। পুলিশ কয়েকজনকে খুঁজেছে। এরপর আমরা সবাই স্থানীয় সাংসদ তালুকদার মো. ইউনুসের কাছে গেছি। তিনি আমাদের বলেছেন, দলের প্রার্থীর বাইরে তিনি কিছু করবেন না। তবে পুলিশ যেন আওয়ামী লীগের কাউকে হয়রানি না করে, সেটি দেখবেন।’ তাজেম আলী আরও বলেন, ‘নৌকার প্রার্থী সবাইকে হুমকি দিচ্ছেন। পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে আমরা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই।’
বাকেরগঞ্জের একজন বিদ্রোহী প্রার্থী বলেন, ক্ষমতা ও টাকার জোরে অনেকে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। ভোটারদের কাছে যাওয়ার বদলে প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা জিততে চাইছেন।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, তাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার পাশাপাশি সরকারি দলের প্রার্থীদের চাপ সামলাতে হচ্ছে। সরকারি দলের মনোনীত প্রার্থীরা চাচ্ছেন শুধু বিএনপি নয়, বিদ্রোহী প্রার্থীরাও যেন মাঠে না থাকেন।
জানতে চাইলে বরিশালের পুলিশ সুপার এস এম আক্তারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারও আবদার থাকতে পারে। কিন্তু পুলিশ এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার জন্য কমিশন যেভাবে বলবে, আমরা সেভাবেই কাজ করব।’


