জামায়াত-আ.লীগ একাকার!
শরিফুল হাসান
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম পৌর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সোহেল রানা। পাটগ্রামে আওয়ামী লীগের এক নেতাকে কুপিয়ে হত্যাসহ সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় করা আটটি মামলার অন্যতম আসামি হলেও তিনি গ্রেপ্তার হননি।
সোহেল রানার চাচা আবু তালেব পাটগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। তিনি সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে নেতৃত্ব দেওয়া সোহেল রানাকে সমর্থন দিচ্ছেন তালেব। আগামী উপজেলা নির্বাচনে সমর্থন পেতে জামায়াতকে সমর্থন দিচ্ছে ২০১২ সালের উপজেলা সম্মেলন নিয়ে বিভক্ত আওয়ামী লীগের একাংশ।
পুলিশ বলছে, পাটগ্রামের কাফিরবাজার এখন জামায়াত-শিবিরের মূল ঘাঁটি। এটি নিয়ন্ত্রণ করেন সোহেল রানা। স্থানীয় লোকজন জানান, কাফিরবাজারের আধা কিলোমিটার দূরে বুড়িমারী-লালমনিরহাট আঞ্চলিক মহাসড়ক ও রেললাইন। সাম্প্রতিক অবরোধে কাফিরবাজার থেকে গিয়েই জামায়াত-শিবির পাশের এলাকায় তাণ্ডব চালায়। আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর ১৫ ডিসেম্বর জামায়াতের ডাকা হরতালে কাফিরবাজার থেকে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা গিয়ে গাছ কেটে ও বৈদ্যুতিক খুঁটি ফেলে সরেয়ারবাজার এলাকায় সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। পুলিশ তাঁদের সরাতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালালে শিবিরের তিনজন কর্মী নিহত হন। এর জেরে জামায়াত-শিবির সরেয়ারবাজার ও মির্জারকোটে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়িতে আগুন দেয়। আগুন নেভাতে গেলে ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মিন্টু মিয়াকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পাটগ্রাম পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক কাদের এলাহী বলেন, ‘সোহেল রানার নেতৃত্বে কাফিরবাজারসহ সীমান্তের বিভিন্ন গ্রামে জামায়াত-শিবির ঘাঁটি গড়েছে। তারা ১৫ ডিসেম্বর আমার বাড়িসহ বিভিন্ন বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন দেয়। অথচ এই সোহেল রানাকে সমর্থন দিচ্ছেন আমাদের দলের নেতা আবু তালেব। এ কারণে অতীতে পুলিশ সোহেলকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।’
তবে সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আটটি মামলাই ষড়যন্ত্রমূলক। আমি চারটি মামলায় জামিন নিয়েছি।’ চাচার (তালেব) রাজনীতির সুবিধা নিচ্ছেন কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে চাচার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি তাঁর বাড়িতেও যাই না।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জানান, ২৫ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মতিয়ার রহমান দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পাটগ্রাম সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে মতবিনিময় সভা করেন। সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের অন্তত ১০০ নেতা-কর্মী উপস্থিত থাকলেও আবু তালেব ছিলেন না। সভায় নেতা-কর্মীরা জানান, তালেবসহ আওয়ামী লীগের একাংশের সহযোগিতা পেয়ে সোহেল তাণ্ডব চালাচ্ছেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরে আলম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ওই সভায় উপস্থিত প্রায় সব নেতাই সোহেলের সঙ্গে তালেবের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জামায়াতকে দলের একাংশের সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন।
অবশ্য আবু তালেব বলেন, ‘সোহেল আমার ভাইয়ের ছেলে, এটি সত্যি, কিন্তু তাকে আমি কোনোভাবে সমর্থন দিই না।’ দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ হয়তো আমার পদে আসতে চায়। সে কারণেই হয়তো তারা আমার অনুপস্থিতিতে এ ধরনের অভিযোগ করছে।’
জামায়াতকে দলের একাংশের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘নেতা-কর্মীরা আমাদের কাছে কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। ঘটনা তদন্তে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদককে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটিও করে দিয়েছি। ওই কমিটির প্রতিবেদন পেলেই আমরা ব্যবস্থা নেব।’
পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে সদ্য যোগ দেওয়া আমিরুজ্জামান বলেন, ‘কাফিরবাজারে সোহেল রানার নেতৃত্বে জামায়াত-শিবির তাণ্ডব চালাচ্ছে বলে আমরাও জেনেছি। সোহেলকে গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।’



