আইনে আছে সবই, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন
শরিফুল হাসান
জবাইখানার বাইরে পশু জবাই করা যাবে না। জবাইয়ের পরিবেশ হতে হবে মানসম্মত। থাকতে হবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কর্মীদের সংক্রামক রোগ থাকা যাবে না। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এ বিষয়গুলো পরিদর্শন করবেন।পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১-তে এমন অনেক ভালো কথাই আছে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতায় এই আইনটির বাস্তবায়ন কার্যত প্রায় শূন্যের কোঠায়।পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের পথে বাধা অনেক। এবং এগুলো দীর্ঘদিনের সমস্যা। প্রথমত, নগরে নেই পর্যাপ্ত জবাইখানা। দেড় কোটি অধিবাসীর রাজধানীতে প্রতিদিন শত শত গরু-ছাগল-মহিষ জবাই হলেও চালু জবাইখানা মাত্র চারটি। আইনের বাস্তবায়ন যাঁদের দেখভালের কথা, সেই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বেশির ভাগ পদই শূন্য। এ পদে নিয়োগও হয় অস্থায়ী। এ কারণে সুষ্ঠু নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে যেখানে-সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পশু জবাই হচ্ছে। ঝুঁকির মধ্যে থাকছে নগরবাসীর স্বাস্থ্য। এভাবে পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন আটকে আছে কাগজে-কলমে। কর্মকর্তাই নেই: ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) ১০টি অঞ্চলে ১০ জনসহ অন্তত ১৪ জন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে দক্ষিণে মাত্র একজন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রয়েছেন। উত্তরে আদৌ কেউ নেই। ফলে প্রয়োজনে দক্ষিণের কর্মকর্তাকেই ছুটতে হয় উত্তরে।ডিসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা ও মাংস ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পশু জবাইয়ের অনুমতি দেওয়ার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেনের বিষয় জড়িত। সে কারণেই এই পদগুলোতে স্থায়ী নিয়োগ না দিয়ে প্রেষণে কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাজটি করছেন পরিদর্শক কিংবা নিম্ন পদের লোকজন।ঢাকা উত্তরের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নূরুন-নবী প্রথম আলোকে বলেন, উত্তরে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও মিরপুরে দুটি জবাইখানা আছে। এই দুটি জবাইখানা পর্যাপ্ত নয়। ফলে যেখানে-সেখানে জবাইয়ের কাজ হচ্ছে। আর উত্তরের পাঁচটি অঞ্চলে পাঁচজন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও তা নেই। উত্তর সিটি করপোরেশনের জনবল কাঠামো এখনো ঠিক হয়নি। ফলে সংকট রয়েই যাচ্ছে।ঢাকা দক্ষিণের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল হারুনও সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে কর্মকর্তার অভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সংকটের কারণে নগরবাসীকে যেভাবে সেবা দেওয়ার কথা ছিল, খুব স্বাভাবিকভাবেই সেটি হচ্ছে না। তবে আমরা এর পরও সাধ্যমতো কাজ করার চেষ্টা করছি।’ জনবল নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘একবার স্থায়ী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি পরে বন্ধ হয়ে যায়। আপাতত জরুরিভিত্তিতে পাঁচজন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চেয়ে মাস দুয়েক আগে অধিদপ্তরে একটি চিঠি দিয়েছি।’প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ডিসিসির এই পদটি প্রথম শ্রেণীর হলেও এখানে কোনো পদোন্নতি নেই। যেখানে চাকরি শুরু, সেখানেই শেষ। তাই কেউ এই পদে যেতে চান না। এই সমস্যা সমাধান করতে হলে সেখানে স্থায়ীভাবে লোক দেওয়া দরকার। বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের মহাসচিব ইমরান হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৮ সালে সিটি করপোরেশনে স্থায়ীভাবে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি হয়নি। আমরা এখন সিটি করপোরেশনকে স্থায়ী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নিয়োগ করতে বলছি। কারণ, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পশু জবাই কিংবা মাংসের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।’ডিসিসি দক্ষিণের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মাংসের বাজার ও জবাইখানা পরিদর্শন, ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানো থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কাজ সবই করতে হয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে। শুক্র, শনি, মঙ্গল, বুধ—এই চার দিন তিনি হাজারীবাগ আর সোম ও বৃহস্পতিবার কাপ্তানবাজার জবাইখানায় যান। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে তাঁকে উত্তরেও যেতে হয়।জবাইখানার অভাব: ডিসিসির তথ্যমতে, আগে ঢাকায় সাতটি জবাইখানা থাকলেও বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণে হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজার এবং উত্তরে মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে একটি করে জবাইখানা আছে। মাংস ব্যবসায়ীরা বলেন, আইন অনুযায়ী বাইরে পশু জবাই নিষিদ্ধ হলেও প্রয়োজনীয়সংখ্যক জবাইখানা নেই বলেই বাজার বা নর্দমার পাশে বহু পশু জবাইয়ের কাজ হচ্ছে।ডিসিসি সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে পশুকে তিন দিন জবাইখানায় রেখে পরে জবাই করার নিয়ম। জবাইয়ের আগে পশুকে পরীক্ষা করা, জবাই করার পর মাংস একটি ঠান্ডা ঘরে সাত-আট ঘণ্টা রাখা, মাংস আবার পরীক্ষার পর উন্নতমানের যানে করে বাজারে নেওয়াসহ বিভিন্ন নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। তবে ডিসিসির জবাইখানাগুলোতে এর কোনো কিছুই মানা হয় না। কাপ্তানবাজার জবাইখানায় গিয়ে দেখা যায় সেখানকার পরিবেশ নোংরা। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশেই পশুর চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কাটা হচ্ছে। জবাইখানায় ঢোকার পথেই দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে ডাস্টবিন।জবাইখানার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিসিসি দক্ষিণের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো পরিবেশ ভালো রাখার চেষ্টা করি। আর জবাইখানায় মোটামুটি সুস্থ গরুগুলোই আনা হয়। অসুস্থ গরু কেউ এখানে আনতে চায় না। তবে বাইরে যেসব পশু জবাই হয় সেগুলোর বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। আমরা মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালাই এবং জরিমানা করি।’উন্নয়ন লালফিতায়: ১৯৯৫ সাল থেকে রাজধানীতে একটি মানসম্মত জবাইখানা তৈরির প্রক্রিয়া চললেও তহবিলের উৎস নিশ্চিত না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৮ সালের নভেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনের এক সভায় গাবতলী এলাকায় আধুনিক কসাইখানা বা জবাইখানা নির্মাণের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়।এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তরের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নূরুন-নবী বলেন, ‘আধুনিক এই জবাইখানাটি হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু তা হচ্ছে না। তবে যেহেতু উত্তরে পড়েছে, আমরা তাই এটি দ্রুত নির্মাণ করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছি।’



