জ্ঞানতাপসের জ্ঞানভান্ডার
শরিফুল হাসান

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ বাড়ি। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায় ভিন্ন এক জগৎ। ভবনের দোতলার প্রতিটি তাকে সাজানো বই। কী নেই তাতে! রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যসহ নানা বিষয়ের নানা বই। আছে অনেক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থও।
রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরের কাছে ৭/এ সড়কের ৬০ নম্বর বাড়িটির নাম ‘জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক বিদ্যাপীঠ’। বাংলাদেশের বিদ্যানুরাগ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও কর্মপ্রেরণায় উজ্জ্বল এক জ্যোতিষ্ক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক। তাঁর নামেই এই বিদ্যাপীঠ।
পুরো ভবনটি ঘুরে বইগুলো নাড়াচাড়া করলেই বোঝা যাবে আসলেই এটি বিদ্যাপীঠ। নিচতলায় অছে একটি ছাপচিত্রের স্টুডিও, তিনতলায় গ্যালারি ও একটি সেমিনার হল। আর দোতলায় শুধু বই। নানা বিষয়ের সাড়ে পাঁচ হাজার বই আছে এখানে। সবগুলোই আবদুর রাজ্জাকের নিজের সংগ্রহের। প্রতিটি কক্ষে বইয়ের তাকের পাশেই আছে বসার জায়গা। অর্থাৎ পছন্দের কোনো বই নিয়ে এখানেই পড়া যাবে। সাজানো-গোছানো এই কেন্দ্রের দেয়ালে থাকা ছবি, বইয়ের আবহ—সবকিছু মিলে শান্তিময় এক পরিবেশ।
এই বিদ্যাপীঠ নির্মাণ করেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। আয়োজকেরা বলছেন, গভীরতম অধ্যয়ন এবং সক্রিয় গবেষণা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে গ্রন্থাগার-সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণা থেকে বের হয়ে আসার উদ্দেশ্যেই এই বিদ্যাপীঠ বা জ্ঞানার্জনকেন্দ্র। একনিষ্ঠ পাঠক, বিদ্বান ও গবেষকেরা এই বিদ্যাপীঠের মাধ্যমে জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাকের গ্রন্থের যে অনন্যসাধারণ সংগ্রহ, তার সন্ধান পাবেন। পাশাপাশি তাঁর অসমাপ্ত কয়েকটি গবেষণাও এখানে আছে।
এই বিদ্যাপীঠের সমন্বয়ক মৈত্রী সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যসহ নানা বিষয়ের বই আছে এখানে। বিদ্যা অর্জনে আগ্রহী ১৮ বছরের ওপরের যে কেউ এখানকার সদস্য হয়ে এখানকার বইগুলো পড়ার সুযোগ পাবেন।’
জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। জ্ঞানপিপাসা, পাঠভ্যাস ও শিক্ষাদানে তাঁর মতো তুল্য ব্যক্তি এ দেশে বিরল। পাণ্ডিত্যে ও জ্ঞানে সারা জীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিয়ে তাঁর সঙ্গে মিশে এ দেশের বহু বিদ্যার্থী নিজেদের মানসভুবন করেছেন সমৃদ্ধ। আর সে কারণে তিনি হয়েছিলেন শিক্ষকদেরও শিক্ষক। আহমদ ছফা, সরদার ফজলুল করিম, আনিসুজ্জামান, হুমায়ুন আজাদসহ বহু জ্ঞানী মানুষ তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলেন।
আবদুর রাজ্জাক ১৯৯৯ সালে মারা যান। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও আবদুর রাজ্জাকের ভাতিজা আবুল খায়ের জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই বইগুলো তাঁর সংগ্রহে ছিল। এই বইগুলো নিয়ে একটি পাঠাগার গড়ার ইচ্ছা ছিল বহুদিন। অবশেষে সেই ইচ্ছা পূরণ হলো। তবে প্রচলিত পাঠাগার বোধ থেকে বেরিয়ে আরও প্রসারিত চেতনা ধারণ করে এর নাম দেওয়া হয়েছে বিদ্যাপীঠ।



