শরিফুল হাসান
টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে টঙ্গীসহ গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। মহানগরের যেখানে-সেখানে আবর্জনার স্তূপ। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে শিল্পকারখানা। সড়ক ও মহাসড়কগুলোর দুই পাশের বিশাল অংশজুড়ে রাখা হয়েছে গাড়ি। আর যানজট যেন নিত্যসঙ্গী। জলাবদ্ধতা, জঞ্জাল ও যানজটের এ মহাসংকট থেকে মুক্তি চান গাজীপুরবাসী। তাঁরা বলছেন, বছরের পর বছর এভাবে চললেও উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। আর তাই এবার তাঁরা এমন একজন মেয়র চান, যিনি এই মহানগরকে পরিকল্পিতভবে গড়ে তুলবেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে মেয়র পদপ্রার্থীরাও দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এম এ বারী বলেন, রাজধানীর এত কাছে হলেও গাজীপুর যেন আলোর নিচে অন্ধকার এক নগর। এত দিন অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে এই শহর। এখন এটি নবজাতক সিটি করপোরেশন। একে সুন্দর করে আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলা দরকার।সরেজমিনে ঘুরে এম এ বারীর কথার চিত্র পাওয়া গেল। ঢাকার আবদুল্লাহপুরের পরে তুরাগ নদ পার হলেই টঙ্গী দিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন শুরু। প্রথমেই ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড। গত কয়েক দিন ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার দুই পাশের অনেকটাই দখলে।সামান্য এগোলেই পথচারী সেতুর দুই পাশে আবর্জনার স্তূপ। ফুটপাতগুলোতে দোকান এমনকি সেতুতেও। টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) কার্যালয় ফেলে একটু এগোলেই স্টেশন রোড। সেখানে ভয়াবহ যানজট। গত দুদিনের বৃষ্টির পর এ এলাকার বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এখানকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন ও তরিকুল ইসলাম বলেন, সারা বছরই এখানে যানজট লেগে থাকে। আর বৃষ্টি হলে তৈরি হয় চরম দুর্ভোগ। টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই ধারে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে পোশাক কারখানাসহ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। অনেক কারখানার তরল বর্জ্য রাস্তায় এসে পড়ছে। বৃষ্টির পানিতে সেগুলো একাকার। ছয়দানা ও মালেকের বাড়ি এলাকায় সড়কের ওপরেই কাঁচা বাজার। ছয়দানা পার হয়ে ভোগড়া এলাকায় এলে দেখা যাবে সব গাড়ি থেমে আছে। এ এলাকার বাসিন্দা নাজিমউদ্দিন জানান, ভোগড়ার এখানেই ঢাকা বাইপাস। এখানে এলে মনে হবে না এটি মানুষের বসবাসের কোনো শহর। সব সময় যানজট। বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা। এমনকি মহাসড়কও পানিতে ডুবে যায়।ভোগড়া পেরিয়ে চান্দনা চৌরাস্তা। ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট। এখানে কোনো বাসস্টপেজ নেই। কিন্তু বাসগুলো রাস্তার ওপর যাত্রী ওঠা-নামা করছে। পশ্চিমে গেলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ী পর্যন্ত সিটি করপোরেশন এলাকা। কাশিমপুর, কড্ডা, বাইমাইল, রাজাবাড়ী, কাতলাখালী, বাগিয়াসহ নগরের ১ থেকে ১৪ নম্বর ওয়ার্ড পড়েছে এ এলাকায়। এ এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, যেখানে-সেখানে কৃষিজমিতে ইটভাটা। শিল্পবর্জ্যে কালো ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে তুরাগ নদ ও এলাকার বিলগুলো।এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দূষণ ছাড়াও এখানকার রাস্তাঘাটগুলো চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী। কাজেই নতুন মেয়রের প্রথম কাজ রাস্তাগুলো ঠিক করা।চান্দনা চৌরাস্তা থেকে সোজা গেলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। এখানকার কাউলতিয়া পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের ১৭ থেকে ২৫ নম্বর ওয়ার্ড। এ এলাকার অনেক রাস্তা এখনো কাঁচা। চৌরাস্তা থেকে পূর্বদিকে মূল শহরের দিকে যেতেই ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনের রাস্তায় বিশাল জায়গা জুড়ে শহরের সব আবর্জনা পড়ে আছে। গাজীপুরে আসা লোকজনকে পোহাতে হয় সেই বর্জ্যের দুর্গন্ধ। শহরের দক্ষিণ ছায়াবীথি, জোড়পুকুর, হারিনাল, রেলজংশনসহ আরও অনেক স্থানে এমন আবর্জনা পড়ে আছে। গাজীপুর শহরের রাজবাড়ী এলাকায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আদালতপাড়া, পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ প্রশাসনিক সব প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শহরের শিববাড়ী থেকে এই রাজবাড়ীর দিকে যেতে পার হতে হবে রেলগেট। এ রেলগেটকে বলা হয় গাজীপুরবাসীর বিষফোড়া। কারণ, সারা দিনে অর্ধশতাধিক ট্রেন যায় এ রেললাইন দিয়ে। এতে সারাক্ষণই যানজট লেগে থাকে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে।দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকার বাসিন্দা এস এম মুজিবুর রহমান বলেন, যিনিই শহরের মেয়র হবেন, তাঁর প্রথম কাজ হবে এখানে একটি উড়ালসড়ক করা। ছোট্ট এ সড়ক হলেই গাজীপুর শহরের মানুষ ভয়াবহ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে।শহর ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ রাস্তাই অনেক সরু। রাতে সড়কবাতিগুলো জ্বলে না। সদরের রেললাইন, পুবাইল, সালনা, হাড়িনাল, মীরেরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদকের আড্ডা বসে নিয়মিত। গাজীপুরবাসী চান, পুরো নগর মাদকমুক্ত হোক। রাজবাড়ী থেকে দক্ষিণে মীরেরবাজার থেকে পুবাইল এলাকা শুরু। ঢাকা বাইপাসের দুই পাশজুড়ে হায়দারাবাদ, মেঘডুবি, নীলেরপাড়া, কানাইয়া, পাগাড়, তালুটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা। এখানে পড়েছে ৩৯ থেকে ৪২ নম্বর ওয়ার্ড। রাস্তাঘাটগুলো খুব সরু। অনেকেই সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে আসছেন। এলাকার লোকজন চান, পরিকল্পনা অনুযায়ী সব হোক।সাধারণ ভোটারদের এসব দাবির কথা বুঝতে পারছেন মেয়র পদপ্রার্থীরাও। বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী এম এ মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি যে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন, সেখানে সব সমস্যা দূর করে গাজীপুরকে একটি আধুনিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে করণীয় বলা আছে। নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা, মাদক, পয়োনিষ্কাশনসহ সব সমস্যা দূর করবেন। রেলগেটে একটি উড়ালসড়ক করবেন। সবার সঙ্গে কথা বলে গাজীপুরকে বসবাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলবেন।আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী মো. আজমত উল্লা খান বলেছেন, তিনি ১৭ বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ছিলেন। তিনি জানেন, কীভাবে একটি নগরকে গড়ে তুলতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গাজীপুরকে একটি আধুনিক ও বসবাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলবেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের চাওয়াকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন।



