শরিফুল হাসান
এক দশক ধরে তাঁরা আছেন ইডেন কলেজে। কারোরই ছাত্রত্ব নেই। কমিটির মেয়াদও নেই। তবু তাঁরা ছাত্রলীগের নেত্রী। ভর্তি-বাণিজ্য, সিট দখলসহ নানা অভিযোগ ইডেন কলেজের ছাত্রলীগের এই নেত্রীদের বিরুদ্ধে। শুধু প্রতিপক্ষ নয়, তাঁদের নির্যাতনের কারণে নিজ সংগঠনের নেত্রীরাও অতিষ্ঠ।জেসমিন শামীমাকে সভাপতি ও ফারজানা ইয়াসমিনকে সাধারণ সম্পাদক করে ২০০৬ সালে ইডেন কলেজের ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। কিন্তু এখনো তাঁরাই ইডেন কলেজ চালাচ্ছেন। ইডেন কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি জেসমিন শামীমা ১৯৯৭-৯৮ শিক্ষাবর্ষে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হন। তাঁর ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে পাঁচ বছর আগে। তিনি এবং সাধারণ সম্পাদক ফারজানা ইয়াসমিন ১৯৯৯-২০০০ সালে মনোবিজ্ঞানে ভর্তি হন। তাঁরও পড়াশোনা শেষ হয়েছে।ইডেন কলেজের ছাত্রলীগ ও সাধারণ ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁরা সেভাবে কলেজের রাজনীতিতে ছিলেন না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দুই বছর ধরে তাঁরা ভর্তি-বাণিজ্য ও হলে সিট-বাণিজ্য করছেন। অভিযোগ আছে এ কাজে তাঁরা কলেজ কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পান। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত বছর টাকার বিনিময়ে এক হাজার এবং এবার প্রায় ৭০০ ছাত্রী ভর্তি করেছেন তাঁরা। এ বছর প্রত্যেক ছাত্রীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও তাঁরা ১০ লাখ টাকা করে দিয়েছেন বলে একাধিক ছাত্রলীগ নেতা জানিয়েছেন।ইডেন কলেজের পাঁচটি হল রয়েছে। ছাত্রীরা জানান, প্রতিটি হলেই দুজনের পাঁচটি করে ১০টি কক্ষ আছে। প্রতিটি কক্ষে ২০-২৫ জন করে থাকেন। হলে উঠানোর সময় তাঁদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেন এই দুই নেত্রী।একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে খোদেজা বেগম হলের ৩০৩, ৩০৫, ৩১৪, হাসনা বেগম হলের ২০৩, ২১৫, ৩১৪, ৩০৪, আয়েশা সিদ্দিকা হলের ৪১৪, ২০৬, ৩১৩, ২০১০, ৪১৯, জেবুন্নেছা হলের ২০২, ২০৮, ৩০৮, রাজিয়া হলের ১১০, ২১০, ২১১, ২০৯ এবং ৩০৮ নম্বর কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এই দুই নেত্রীর হাতে। এসব কক্ষে থাকা ছয়জন ছাত্রী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের হলে তোলার সময় সাত থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। টাকা দিয়েছেন কেন, জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, টাকা না দিলে তাঁরা হলে উঠতে পারতেন না।কলেজের ছাত্র ফেডারেশনের এক নেত্রী বলেন, হলের ক্যান্টিনের খাওয়ার মান নিয়ে তাঁরা প্রতিবাদ করায় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আখি, আরিফা, তানিয়াসহ বাম সংগঠনের মেয়েদের মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেন জেসমিন।ছাত্রলীগের ইডেন কলেজ শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক শারমিন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, কলেজের ভর্তি-বাণিজ্য, সিট নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই, যার সঙ্গে জেসমিন জড়িত নেই। একই অভিযোগ করেন সাংগঠনিক সম্পাদক তানিয়া সুলতানা ও সহসম্পাদক কানিজ ফাতেমা।এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে জেসমিন শামীমা বলেন, সবই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। প্রতিপক্ষরা এসব ছড়াচ্ছে। ছাত্রত্বের মেয়াদ আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব নিয়ে তিনি কোনো কথা বলবেন না। তাঁর বিরুদ্ধে এখন যা বলা হচ্ছে, সবই মিথ্যা। নিজের বিয়ের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। সাধারণ সম্পাদক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ছাত্রত্ব আছে কি না, এগুলো জিজ্ঞেস করলে তিনি কোনো কথা বলবেন না। এগুলো তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। কমিটির মেয়াদ না থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের অসংখ্য কমিটির মেয়াদ নেই। কেন্দ্রীয় নেতারা চাইছেন বলেই এই কমিটি চলছে। ইডেনের কমিটির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মাহমুদ হাসানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইডেনের ভর্তি-বাণিজ্যের টাকা ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও পাচ্ছেন, এমন অভিযোগ সম্পর্কে মাহমুদ হাসান বলেন, এগুলো ভিত্তিহীন। চারজন বহিষ্কার: গত শুক্রবার ইডেনে সংঘর্ষের জের ধরে কলেজ শাখার সহসভাপতি চম্পা খাতুন, সাংগঠনিক সম্পাদক শারমিন সুলতানা ও তানিয়া সুলতানা এবং সহসম্পাদক কানিজ ফাতেমাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।বহিষ্কৃতদের অভিযোগ, তাঁরা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতির অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মাহমুদ হাসান গঠনতন্ত্র না মেনে তাঁদের বহিষ্কার করেছেন। এর ফলে ইডেনের সংকট আরও প্রকট হবে। ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদ হাসান বলেন, শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইডেন কলেজে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।



