শরিফুল হাসান
রাজশাহী মহানগরের স্বল্প আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীর ভোট টাকার বিনিময়ে কেনা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিপুল টাকা ছড়ানোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন প্রধান দুই মেয়র পদপ্রার্থীর এজেন্টরা। তবে নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ বলছে, প্রার্থী ও তাঁদের লোকজন মুখে মুখে এসব অভিযোগ করলেও প্রমাণ দিতে পারছেন না। ফলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে তৎপর হতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে ভোটের আগের দিন যেন টাকাপয়সার লেনদেন না হয়, সে ব্যাপারে প্রশাসন সতর্ক থাকবে।আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, জামায়াত-শিবির কোটি টাকা নিয়ে এ নির্বাচনে মাঠে নেমেছে। তারা যেকোনো মূল্যে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করতে চায়। তাই জামায়াতের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৮ দল-সমর্থিত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেনকে বিভিন্ন সময় টাকা দেওয়া হচ্ছে। মোসাদ্দেক সেই টাকা কর্মীদের যেমন দিচ্ছেন, তেমনি মহানগরের গরিব মানুষকে দিয়ে ভোট কিনতে চাইছেন। অন্যদিকে বিএনপির একাধিক নেতার অভিযোগ, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান মহানগরের বিভিন্ন পেশাজীবী ও কয়েকজন ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের মেয়র থাকাকালেও তিনি অনেক টাকা আয় করেছেন। সেই অর্থ এখন তিনি নির্বাচনে খরচ করছেন। আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একজন মেয়র পদপ্রার্থী সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন। তবে বাহারি প্রচারণা বলে দেয়, বাস্তবতা ভিন্ন। মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নাগরিক কমিটির প্রার্থী খায়রুজ্জামানের নির্বাচনী এজেন্ট নওশের আলী প্রথম আলোকে বলেন, নগরের মালদা কলোনি, জিয়ানগরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় মোসাদ্দেক হোসেনের কর্মী-সমর্থকেরা কয়েক দিন ধরে ভোটারদের টাকা দিচ্ছেন। এ ছাড়া জামায়াত-শিবির কোটি কোটি টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছে। তারা টাকা দিয়ে গরিব মানুষের সব ভোট কিনে নিতে চাইছে। অন্যদিকে জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও মোসাদ্দেকের নির্বাচনী এজেন্ট তোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ করেন, দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাগুলোতে নারী ভোটারদের টাকা দিচ্ছেন কয়েকজন সাংসদ ও ব্যবসায়ী। তবে ওই সাংসদ বা ব্যবসায়ী কারা, সে বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি। তবে রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান সরাসরি অভিযোগ করেন সদ্য সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে সাবেক মেয়র তো অনেক কালোটাকা আয় করেছেন। সেগুলোই তিনি খরচ করছেন।’ মহানগর জামায়াতের রাজনৈতিক সেক্রেটারি আবু মো. সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছি ঠিক। কিন্তু তাঁকে টাকাপয়সা দিয়ে কোনো সহায়তা করিনি। ওই অভিযোগ ভিত্তিহীন। তবে তাঁকে বিজয়ী করার জন্য আমরা গায়গতরে খাটছি।’ টাকা ছড়াছড়ির এ অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘মেয়র পদপ্রার্থীরা কেউ তো কারও বিরুদ্ধে টাকা ছড়ানোর লিখিত অভিযোগ দেননি। লিখিত অভিযোগ না পেলে কিছুই বলা যাবে না।’ কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরাও পরস্পরের বিরুদ্ধে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ তুলছেন। ৮ জুন ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে বিতরণের সময় সাড়ে ১৪ হাজার টাকাসহ আন্দ্রিয় কর্মকার নামের একজনকে আটক করেন এলাকাবাসী। পরে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয় বলে জানা গেছে। এ ছাড়া টাকা বিতরণ নিয়ে নগরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে গত মঙ্গলবার রাতে দুই কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। নগরের বোয়ালিয়া থানার একজন উপপরিদর্শক বলেন, রাতে বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিম্ন আয়ের ভোটারদের মধ্যে টাকা বিলানো হচ্ছে বলে তাঁরাও শুনছেন। কিন্তু তাঁরা হাতেনাতে কাউকে ধরতে পারছেন না। এ ব্যাপারে রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার জানান, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের একজন কাউন্সিলর পদপ্রার্থী আরেকজনের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ করেছেন। সেটি তদন্ত করা হচ্ছে। নির্বাচনী কাজে যুক্ত একজন তরুণ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকা বিলানো হয় রাতের আঁধারে। সাদা পোশাকে পুলিশ অভিযানে না নামলে টাকা ছড়ানোর অভিযোগের সত্যতা মিলবে না। বিশেষ করে, ভোটের আগের দিন (আজ শুক্রবার) রাতে বিভিন্ন জায়গায় টাকা দেওয়া হবে বলে আমাদের কাছে খবর রয়েছে। দেখি শুক্রবার কিছু করা যায় কি না।’



