বাংলাদেশের সামনে বিরাট সুযোগ
শরিফুল হাসান
সৌদি আরব সরকার দেশটির কয়েকটি স্থানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিশেষ শিল্প এলাকা গড়ার পরিকল্পনা নিচ্ছে। এ জন্য আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ১০ লাখ শ্রমিক সেখানে কাজ পেতে পারেন। একইভাবে মালয়েশিয়ায় কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ছয় লাখ লোক লাগবে। সেখানেও দুই থেকে তিন লাখ শ্রমিক পাঠানো সম্ভব। কিন্তু এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাসের শ্রম শাখা থেকে ঢাকায় জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) সম্প্রতি পাঠানো দুটি প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রবাসী শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের মহাসচিব হেদায়েত উল্লাহ প্রশ্ন করেন, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির যে বিশাল সম্ভাবনা, তা কাজে লাগাতে সরকার কি আসলেই উদ্যোগ নেবে? নিলে কখন নেবে? একই প্রশ্ন জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও।বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, দুই দেশের কিছু অসাধু লোকের কারণে মালয়েশিয়ার বাজারটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চাহিদা না থাকায় সৌদি আরবও লোক নেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিশাল ওই দুটি শ্রমবাজার চালু এবং বাংলাদেশ যেন ওই বাজার দুটি ভালোভাবে ধরতে পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।সৌদি আরব থেকে ঢাকায় পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির রিয়াদ, মদিনা, রাবিগ ও জিগানে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা গড়া হচ্ছে। এ ছাড়া জেদ্দাসহ তিনটি স্থানে বিশেষ শিল্পাঞ্চল হচ্ছে। বিশেষ শহর উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায়। এসব এলাকায় রেল, বিমানবন্দর, সড়ক ও বিশাল কয়েকটি হাসপাতাল হবে। এ জন্য বিপুলসংখ্যক লোক লাগবে।কুয়ালালামপুর থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, মালয়েশিয়া পূর্ব উপকূলীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইস্ট কোস্ট ইকোনমিক রিজিওন—ইসিইআর) নামে একটি বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে। এতে পাঁচ লাখ ৬০ হাজার কর্মী লাগবে। এ ছাড়া উত্তর করিডর অর্থনৈতিক এলাকা (নর্দার্ন করিডর ইকোনমিক রিজিওন—এনসিইআর) নামের আরেকটি প্রকল্পে প্রতিবছর পাঁচ হাজার নির্মাণশ্রমিক লাগবে। ইস্কান্দর আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্প এবং সারাওয়াক করিডর অব রিনিউবেল এনার্জি (এসসিওআরই) নামের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী লাগবে মালয়েশিয়ার। সব মিলিয়ে সেখানে আগামী কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক বিদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করলেই বাংলাদেশ এই বাজার ধরতে পারবে।জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা জানিয়েছেন, অবকাঠামো নির্মাণসহ বেশির ভাগ কাজের শ্রমিকের জন্য দুটি দেশই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ফিলিপাইনসহ বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল।জনশক্তি রপ্তারিকারকদের সংগঠন বায়রা সূত্রে জানা গেছে, মন্দাসহ কয়েকটি কারণে মালয়েশিয়া এক বছর বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রেখেছিল। তবে এ বছরের মার্চ থেকে আবার বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ইতিমধ্যে নেপাল থেকে এক লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া। তবে বাংলাদেশের বাজার এখনো বন্ধ। খুব শিগগির বাজার চালু করতে পারলে মালয়েশিয়ায় দুই-তিন লাখ বিদেশি শ্রমিক পাঠানো সম্ভব। একইভাবে সৌদি আরবে ১০ লাখ লোক পাঠানো যেতে পারে।বিএমইটির মহাপরিচালক খোরশেদ আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রকল্পে যে বিপুলসংখ্যক লোক লাগবে, তা দূতাবাসের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। ওই বাজার ধরতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো কাজ করছে। দুই দেশে প্রভাব রয়েছে এমন অনেক বাংলাদেশির মাধ্যমে দেশ দুটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের একটি সফর হলে বাংলাদেশ এই বাজার ধরতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।’মালয়েশিয়ায় বর্তমানে চার লাখ ৫১ হাজার ২৪৭ জন বাংলাদেশি কাজ করছেন। তাঁদের সিংহভাগই উৎপাদন, নির্মাণ খাত, পামচাষ ও রাবার খাতে কাজ করেন। এসব খাতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে দেড় বছর ধরে দেশটিতে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রায় বন্ধ। এ ছাড়া সৌদি আরবে প্রায় ২২ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জনশক্তি রপ্তানির বাস্তব অবস্থা এবং এ ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় মতামত ও তথ্যাদি চেয়ে বিএমইটির মহাপরিচালক গত জানুয়ারিতে বিভিন্ন দূতাবাসে প্রতিবেদন চেয়ে পাঠান। জবাবে সম্প্রতি মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে দুটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়।বিএমইটির পরিচালক (গবেষণা ও সিআরএম) নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, জনশক্তি রপ্তানির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ জানতে ওই চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার শ্রম শাখা থেকে সম্প্রতি সেখানকার সার্বিক অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন এসেছে। ওই প্রতিবেদন বলা হয়েছে, দেশটির কয়েকটি প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক কর্মী লাগবে।বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাজার সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া। সেখানে প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক বিদেশি শ্রমিক লাগে। কাজেই যেকোনো মূল্যে ওই বাজার চালু করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার তার মতো করে কাজ করবে। বায়রা সরকারের অপেক্ষায় বসে নেই। ইতিমধ্যে বায়রা ওই বাজার চালু করতে নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং সে অনুযায়ী কাজ চলছে। তবে এ ব্যাপারে এখনই বিস্তারিত বলা যাবে না।দূতাবাস থেকে পাঠানো চিঠিতে বিগত তিন বছরে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার জন্য বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দাকে দায়ী করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি কর্মী নিয়োগকারী দেশগুলোয় সাধারণ কর্মীদের তুলনায় দক্ষ ও পেশাদার কর্মীর চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ দক্ষ লোক দিতে পারছে না। ফলে মালয়েশিয়ার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশি কর্মীদের কাজে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছে।সৌদি আরবের প্রতিবেদন: সৌদি আরবের জনশক্তি রপ্তানি কমার কারণ হিসেবে ভিসা সংগ্রহে বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির অনৈতিক প্রতিযোগিতা ও কতিপয় বাংলাদেশির বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দায়ী করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেকে এক মালিক ছেড়ে অন্য মালিকের কাছে চলে যাওয়ার কারণেও সমস্যা হচ্ছে।সৌদি আরবের সমস্যা হিসেবে বলা হয়েছে, বর্তমানে কফিল (স্পন্সরশিপ বা মালিকানা) পরিবর্তনের সুযোগ না থাকায় প্রবাসীরা অধিকতর সম্মানজনক পেশায় নিয়োগ ও অর্থ উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ২০০৭ সালের মার্চ থেকে এ সমস্যা হচ্ছে।সৌদি আরবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রচলিত ২০ শতাংশ কোটা প্রথা বাতিল হলে অর্থাৎ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা হলে ২০১৫ সাল নাগাদ প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কর্মীর চাকরি বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্মাণ, স্বাস্থ্য, শিল্প, সেবা, কৃষি প্রভৃতি খাতে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা বেশি কাজ পাবেন।



