নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে ঈদের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে
শরিফুল হাসান
ঈদের পর মালয়েশিয়ার মানব- সম্পদমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে সে দেশে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সিদ্ধান্ত হতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ রকম আশা করা হচ্ছে। তবে দেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মধ্যে নতুন এ আলোচনা-প্রক্রিয়ার সাফল্য নিয়ে সংশয় রয়েছে।বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার মালয়েশিয়ার দরজা প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কয়েক দফায় কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা হলেও এ দেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়নি দেশটি। সরকার এখন আশা করছে, ঈদের পরপরই মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এস সুব্রামানিয়ামের সফরের মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসবে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশীয় মানবসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দল। তারা বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির প্রক্রিয়া সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিরা জানান, দেশটির কৃষি, বনায়ন, উৎপাদন ও নির্মাণক্ষেত্রে বাংলাদেশি শ্রমিকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। এ প্রেক্ষাপটে মালয়েশীয় মন্ত্রিসভা গত সপ্তাহে বিদেশি শ্রমিক ও অবৈধ অভিবাসী বিষয়ে এক বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানির পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার জন্য মানবসম্পদমন্ত্রীকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানসচিব জাফর আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে কয়েক দফায় আলোচনা হয়েছে। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে আমরা আশা করছি।’গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজার চালুর জন্য কূটনৈতিকভাবে নানা ধরনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে সরকার। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবার কথা বলেছেন। সর্বশেষ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল মে মাসে মালয়েশিয়া সফর করে। এরপর জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসেছিল। জানা গেছে, তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এবার মানবসম্পদমন্ত্রী এসে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশে থেকে কর্মী পাঠানো বন্ধ হওয়ার মূল কারণ নানা ধরনের অনিয়ম। সেই সমস্যা দূর করতে এবার দুই দেশের মধ্যে সরকারিভাবে লোক পাঠানোর সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ‘২০০৭ ও ২০০৮ সালে চার লাখের বেশি কর্মী মালয়েশিয়া যান। তাঁদের কাছ থেকে দালালেরা দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে নিয়েছে। কোনো কোম্পানিতে হয়তো ১০০ লোক লাগবে। দালালেরা সেখানে জালিয়াতি করে এক হাজার লোক পাঠিয়েছে। এসব কারণে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ না পেয়ে রাস্তায় কাটিয়েছেন। এ কারণেই এবার উভয় দেশ সরকারিভাবে লোক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’সরকারি সূত্র বলেছে, যাঁরা সরকারিভাবে নাম নিবন্ধন করেছেন, তাঁদের মধ্য থেকেই এবার মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানো হবে। এ ক্ষেত্রে অভিবাসন খরচ সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা হবে বলে আশা করছে সরকার। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার আগে কাউকে টাকা না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘চার বছর ধরে আমরা শুনছি, কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে। কিন্তু কোনো সফলতা দেখছি না। এবারও হয়তো সেটিই হবে।’ সরকারিভাবে লোক পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘এ কারণেই যত বিলম্ব।’লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নত অর্থনীতির এ দেশটি। বনজঙ্গল দিয়ে লোক পাঠানোসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ১৯৯৬ সালে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয় তারা। বাংলাদেশের ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর সেই নিষেধাজ্ঞা তোলা হয় ২০০০ সালে। কিন্তু একই সমস্যার কারণে ২০০১ সালে আবার জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। সেই নিষেধাজ্ঞা তোলা হয় ২০০৬ সালে। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের অবৈধ তৎপরতার কারণে ২০০৯ সালের মার্চে আবার লোক নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া।



