গতিরোধকের ফাঁদ পেতে যানবাহনে নাশকতা

Spread the love

শরিফুল হাসান

সড়কের গতিরোধকে গাড়ির গতি কমার পরপরই হামলা করে পিকেটাররা। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বেতগাড়ি এলাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের একটি গতিরোধক  প্রথম আলো
সড়কের গতিরোধকে গাড়ির গতি কমার পরপরই হামলা করে পিকেটাররা। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বেতগাড়ি এলাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের একটি গতিরোধক প্রথম আলো

১০ কিলোমিটারে ২০টি গতিরোধক। সব কটি অবৈধ। অপ্রয়োজনীয় উঁচু। গতি কমিয়েই চলতে হয় সব যানবাহনকে। এই সুযোগে চলে ভাঙচুর-আগুন।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের এই অংশটি বগুড়ার আলোচিত শাজাহানপুর থানা এলাকায় পড়েছে। ছিলিমপুর থেকে আড়িয়াবাজারের মধ্যে এসব গতিরোধক। এলাকাটি জামায়াত-অধ্যুষিত। এখানকার উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ইয়াছিন আলী। শাজাহানপুর থানার ওসিকে জমি ‘ঘুষ’ দিয়ে তিনি ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছেন।
জেলা পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, অবরোধ চলাকালে প্রায় প্রতিদিনই এই মহাসড়কের শাজাহানপুর এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে। ২৬ নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত এখানে ৫০০ গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আগুন দেওয়া হয়েছে অন্তত ৫০টি যানবাহনে। শনিবার রাতেও এখানে তিনটি ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। গতকাল দেওয়া হয়েছে তিনটিতে। দুটি ঘটনাই ঘটেছে গতিরোধকের কাছে। যেন ফাঁদ পেতে নাশকতার আয়োজন।
শনিবার রাতে আগুন পুড়ে যাওয়া একটি ট্রাকের চালক কামালউদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, ‘সামনে-পেছনে সেনা পাহারায় কয়েক শ গাড়ি যাচ্ছিল। গতিরোধকের কারণে গাড়ির গতি অনেক কমিয়ে পার হচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল তাঁর গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এরপর তারা রামদা-হকিস্টিক নিয়ে হামলে পড়ে। নির্বিচারে গাড়ি ভাঙচুরের পর তারা আগুন দিয়ে দ্রুত চলে যায়।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগের বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মহাসড়কের এসব গতিরোধকের বেশির ভাগই অবৈধ। সড়ক ও জনপথ বিভাগকে না জানিয়ে এগুলো রাতের আঁধারে ইচ্ছেমতো নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো ট্রাফিক আইন ও নিয়মকানুন মানা হয়নি।’
অবৈধ গতিরোধকগুলো ভাঙা হয়নি কেন—জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি সম্প্রতি এখানে এসেছেন। মাত্রই বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে।
পুলিশ জানায়, গতকাল রোববার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায় শতাধিক আটকে পড়া যানবাহন পারাপার হচ্ছিল। বহরের আগেপিছে ছিল সেনাবাহিনীর ‘শীতকালীন মহড়ার’ গাড়ি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মহাসড়কের সাজাপুর-রাধারঘাট এলাকায় ফটকি সেতুর কাছে (এখানে দুটি গতিরোধক আছে) পেট্রলবোমা হামলা চালিয়ে তিনটি ট্রাক পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে দেখা যায়, বগুড়ায় যানবাহনে যত হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তার শতকরা ৯৫ ভাগ এই শাহাজানপুর এলাকায়। কিন্তু এত দিনেও পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। শাজাহানপুর থানার পুলিশ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান বা কাউকে গ্রেপ্তারও করেনি। কেবল শনিবার রাতের হামলার ঘটনায় রোববার বগুড়া শহর থেকে র্যাব-পুলিশ এসে অভিযান চালিয়ে ৬৩ জনকে আটক করে।
গতকাল দুপুরে মোটরসাইকেলে করে আড়িয়াবাজার থেকে বগুড়া শহরে আসতে দেখা যায়, শহরের বেতগাড়ীতে দুটি, ফটকি সেতুর আগে পরে দুটি, শাজাহানপুর থানার সামনে দুটো, মাঝিড়ায় দুটো, সি ব্লকে একটি, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এলাকায় একটি, নয়মাইল এলাকায় দুটি, আড়িয়াবাজার এলাকায় দুটি, ফুলতলায় দুটি এবং মেডিকেল কলেজের সামনে দুটো গতিরোধক।
শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মহাসড়কে এ ধরনের গতিরোধক করার নিয়ম নেই। জনগুরুত্বপূর্ণ নয় এমন গতিরোধকগুলো চিহ্নিত করা হবে।
বগুড়ার জেলা পুলিশ সুপার মো. মোজাম্মেল হক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মহাসড়কে নাশকতা চালানোর কৌশল হিসাবে রাতারাতি এই সড়কে অনেক গতিরোধক তৈরি করেছে দুর্বৃত্তরা। সড়কের শাজাহানপুর এলাকায় অন্তত ৩০টি গতিরোধক আছে, যেগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। ট্রাফিক আইন মেনে নির্মিত না হওয়ায় রাতের আঁধারে দূর থেকে এগুলো চালকের নজরে পড়ছে না। একেবারে কাছাকাছি আসার পর চালকেরা যখনই যানবাহনের গতি কমিয়ে দিচ্ছে, তখনই হামলা চালাচ্ছে দুর্বৃত্তরা।
পুলিশ সুপার দাবি করেন, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি সবার নজরে আনা হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন দ্রুতই সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.