কলম্বো প্রসেসের ২১ সুপারিশ

Spread the love

বাধ্যবাধকতা না থাকায় বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

শরিফুল হাসান

অভিবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, সদ্য সমাপ্ত কলম্বো প্রসেস সম্মেলনের ২১ দফা সুপারিশ অভিবাসী কর্মীদের স্বার্থরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কিন্তু সেগুলো মানার ব্যাপারে আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকায় এর বাস্তবায়নের বিষয়টি অনিশ্চিত। এ ছাড়া ঢাকা ঘোষণার সঙ্গে মিল রেখে আইন ও নীতিমালা করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।চতুর্থ কলম্বো প্রসেস সম্মেলন শেষে গৃহীত ঢাকা ঘোষণায় বিদেশগামী কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা বন্ধ, তাঁদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ ও পরিবারের স্বার্থ সুরক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।সম্মেলনের ফল সম্পর্কে জানতে চাইলে কলম্বো প্রসেসের এখনকার চেয়ারম্যান বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবারের কলম্বো প্রসেস অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। সম্মেলনে অভিবাসী শ্রমিক প্রেরণকারী ১১টি দেশেরই মন্ত্রী পর্যায়ের নেতারা অভিবাসন খাতের সব অনিয়ম দূর করতে একমত পোষণ করেছেন। কিন্তু সুপারিশগুলো মানতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আমরা মনে করি, নৈতিকভাবে সব দেশ এটি মেনে চলবে।’এশিয়ার অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট ১৮টি বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান কারাম এশিয়াও আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছে। সংগঠনটির সমন্বয়ক হারুণ আল-রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, অভিবাসীদের নিয়ে এমন আশাব্যঞ্জক সম্মেলন বা কথাবার্তা অতীতেও কমবেশি হয়েছে। কিন্তু মানার বাধ্যবাধকতা না থাকলে সুপারিশ যত ভালোই হোক না কেন, তা খুব বেশি কাজে লাগে না।হারুণ আল-রশিদ মনে করেন, শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলো ঢাকা ঘোষণাকে মানদণ্ড ধরে সমন্বিত আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করলেই কেবল এ ঘোষণা কাজে আসবে।ঢাকা ঘোষণা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গৃহীত ২১টি সুপারিশ, এমনকি এর মধ্যে কয়েকটিও বাস্তবায়ন করা গেলে তা প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় খুবই কার্যকর হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও সে রকমই মনে করেন। যেমন ঘোষণার ১-এর (ঙ) অনুচ্ছেদে অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধ, ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ, নিয়োগদান-প্রক্রিয়ায় সততা, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও নজরদারি, অব্যবস্থাপনা প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন এবং আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমকে অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এই ধারাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন অভিবাসন-বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা ইমা রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক আনিস আহমেদ খান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, যদি এই একটি ধারা অন্তত বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলেই এই খাতের বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।ঢাকা ঘোষণার ২-এর (ছ) ধারায় বলা হয়েছে, অভিবাসী শ্রমিক বিশেষত নারীদের সহযোগিতার আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে অভিবাসন কার্যালয়, দূতাবাস এবং শ্রমকল্যাণ দপ্তরের দক্ষতা বাড়ানো হবে। বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নারীসংক্রান্ত জ্যেষ্ঠ গবেষক নিশা ভারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে তা অনেক কাজে আসবে।ঘোষণায় লিবিয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বার্থরক্ষা এবং দ্বিপক্ষীয় সংলাপের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় সহযোগিতার যে কথা বলা হয়েছে, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।সম্মেলনের ঘোষণাগুলো নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমিক গ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রম ও কর্মসংস্থানসচিব মুবারক আল দেহরিও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অভিবাসী শ্রমিকদের মর্যাদা দেওয়ার বিষয়ে শ্রমিক গ্রহণকারী দেশগুলো এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক। ঢাকা ঘোষণার বিষয়গুলো শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলোর আবুধাবি সম্মেলনে মাথায় রাখা হবে বলেও জানান দেহরি।ঢাকা ঘোষণার বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে সম্মেলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত প্রবাসীকল্যাণসচিব জাফর আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ঢাকা ঘোষণাকে একটি বিশাল সফলতা বলে মনে করছি। প্রথমত এই সম্মেলনেই আমরা প্রথমবারের মতো কলম্বো প্রসেসের কর্মপ্রণালি ও লিখিত নীতিমালা করেছি। দ্বিতীয়ত, ভিসা ট্রেডিং, নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় অনৈতিকতার মতো বিষয়ও এবারই প্রথম আমরা লিখিতভাবে ঢাকা ঘোষণায় নিয়ে আসতে পেরেছি। সার্বিকভাবে ঢাকা ঘোষণা মর্যাদার সঙ্গে অভিবাসন নিশ্চিত করবে।’বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে নিয়মিত পরামর্শ সভার অঙ্গীকারকে এক ধরনের ইতিবাচক চাপ বলে মনে করেন প্রবাসীকল্যাণসচিব। তাঁর মতে, ঢাকা ঘোষণার সঙ্গে সংগতি রেখে আইন ও নীতিমালা তৈরি করাই বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে দৃঢ়তার সঙ্গে সচিব বলেন, ‘আমরা এটি করবই।’ঢাকা সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন। ঢাকা ঘোষণায়ও তা গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়। বিদেশে কর্মী পাঠানোর দায়িত্বপালনকারী সংস্থা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক খোরশেদ আলম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঢাকা ঘোষণার আলোকে আমরা একজন কর্মীর বিদেশে যাওয়া থেকে শুরু করে ফিরে আসা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া মর্যাদাপূর্ণ করতে কাজ করে যাব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.