শরিফুল হাসান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক ছাত্র , বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সহকারি পরিচালক মেহেদি হাসান আত্মহত্যা করেছেন। যে কোন মানুষত বটেই বিশেষ করে তরুণ কেউ আত্মহত্যা করলে আমার ভীষণ কষ্ট লাগে। বুকটা হাহাকার করে। মনে হয় আমাদের কী আরেকটু কিছু করার ছিল!
মেহেদির আত্মহত্যার খবরটা শুনে সেই একই অনুভূতি হচ্ছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানলাম, মানসিক বিষন্নতা থেকেই মেহেদি রোববার নিজের মেসে আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সূত্রে জানলাম, কিছুদিন আগে মা মারা যাওয়ার পর থেকে মেহেদি হতাশায় ছিলেন। ঘুমাতে পারতেন না। এ কারণে তাকে একমাস আগে মোহাম্মদপুরে ভাইয়ের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কাউকে না জানিয়ে সেখান থেকে মেসে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। খবরটা ভীষণ বেদনাদায়ক।
আমার জন্য আরেকটু বেদনাদায়ক কারণ ব্যক্তিগতভাবে দেখা হলেও, না চিনলেও ফেসবুকে বন্ধু ছিল। আমার ইনবক্সজুড়ে এখনো মেহেদির অনেকগুলো মেসেজ। চারবছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্স বিভাগের এক ছাত্র তরুণ কটুক্তি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল। তখন আমি এ নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। এর সূত্র ধরেই আমাকে প্রথম মেসেজ দেন মেহেদি।
তাতে তিনি বলেন, শিক্ষকদের অবহেলা এবং খারাপ ফলও তরুণের আত্মহত্যার কারণ। এরপর আরো কয়েক দফা নানা বিষয়ে আমাকে ইনবক্স করে মেহেদি।আজকে মেহেদির আত্মহত্যার খবরে ভীষণ মন খারাপ হলো। আমারও মা মারা গেছে। আমি জানি এটা সংকটের। হতাশার। কিন্তু তাই বলে আত্মহত্যা করলে তো চলবে না। শুধু মেহেদি কেন গত দুই আড়াই বছরে প্রায় অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আত্মহত্যা করেছে।
আমি অনেকবার এ নিয়ে লিখেছি। এই দেশের প্রত্যেকেটা তরুণ তরুণীকে ভালোবাসা জানিয়ে বলছি, প্লিজ আত্মহত্যার পথে যেও না। যতোই কষ্ট হোক বেঁচে থাকার লড়াইটা করো। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নাও। আর যে কোন সময় যে কোন প্রয়োজনে আমি অন্তত আপনাদের কথা শুনতে চাই। আপনাদের বন্ধু হতে চাই। কারণ, একেকটা মৃত্যু আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়! বারবার মনে হয়, আমাদেরও অনেক দায়িত্ব ছিল!আসলে যে কোন মানুষের আত্মহত্যার খবর দেখলে আমার মনে হয়, আমরা সম্মিলিতভাবে ব্যর্থ।
এই তো মাসখানেক আগেই বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা কিশোরদার সঙ্গে কথা বলছিলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, করোনাকালে আমরা দেখেছি অনেক তরুণ আত্মহত্যা করছে। এখনো এটি বড় সমস্যা। এ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছু বলবেন কী?কিশোরদা উত্তরটা মনে গেঁথে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘একটা মানুষ কেন আত্মহত্যা করতে চায়?
এজন্য যতোটা তিনি দায়ী আশেপাশের মানুষও কিন্তু কম দায়ী না। সবাই তাকে এমন একটা বার্তা দেয় যে সে কোন কাজের না। কাজেই এখানে আশেপাশের মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।’এই কথাটা আমার মনের মধ্যে গেঁথে আছে।
আসলেই আশেপাশের মানুষগেুলোর ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। দেখেন আমরা একটা সংকটময় সময় পার করছি। সারাক্ষণ পড়াশোনার চাপ, পরিবারসহ নানা জনের বকা-ঝকা, বেকারত্ত্বসহ নানা সংকট, একটা চাকুরি বা সাফল্যের পেছনে দৌড়া, ব্যক্তিগত নানা কষ্ট, হতাশা; সব মিলিয়ে আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েগুলো ভীষন একা।
দেখেন বাস্তব জীবন বা ফেসবুকে হাজার বন্ধুর সাথে থেকেও একেকজন এতোটাই একা যে প্রচণ্ড কষ্টের মুহুর্ত শেয়ার করার জন্যও কাউকে পায় না। তাই সবাইকে অনুরোধ আপনার বন্ধুর খোঁজ নেন। চলুন আমরা সবাই সবার পাশে দাঁড়াই।
একটা মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে তো বড় কিছু নেই। এই দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে আমার অনুরোধ, আপনার আর্থিক অবস্থা যেমনি হোক আপনার বন্ধু, আপনার পাশের ছেলেটির খোঁজ নেন। কখনো একটু সামান্য সাহায্য, একটু ভালোবাসা, সহমর্মিতা আরেকজন মানুষকে নতুন জীবন দিতে পারে।
আমরা সবাই মিলে হয়তো আরেকজন মানুষের আশ্রয় হতে পারি। বন্ধু হতে পারি। আসলেই সবাইকে নিয়েই তো মানবজীবন তাই না! মনে রাখবেন শুধু নিজের জন্য বাঁচতে চাইলে হতাশা গ্রাস করতে পারে কিন্তু মানুষের জন্য, সবার জন্য বাঁচতে চাইলে জীবনটা অনেক অর্থবহ মনে হবে। আসুন তাই আরেকজনের পাশে দাঁড়াই। সবাই মিলে বাঁচি।


