সংগ্রামী মামুন এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

Spread the love

আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাজী মামুন হায়দার। এক সময়ের সাংবাদিক মামুন আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের শিক্ষক। আজই ও নিয়োগ পেয়েছে। সে অর্থে আজ ওর স্বপ্নের তিন। মামুন সাড়ে তিন বছর একটি দৈনিকে আমার সহকর্মী ছিলো। কতো আনন্দ-মান-অভিমান-খুনসুটি আছে আমাদের বলে বোঝানো যাবে না। ওর সংগ্রামী জীবনের গল্প যে কাউকে সাহস যোগাবে। আমি জানি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবদিকতা বিভাগকে সমৃদ্ধ করবে মামুন। সবাই মিলে সেই দোয়াই করি। তার আগে চলুন শুনি মামুনের জীবন সংগ্রামের গল্প।

মামুন হায়দার ওরফে রানার সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে। হঠাৎ একদিন অফিসে গিয়ে দেখি এক বাউল আমাদের সঙ্গে কাজ করতে এসেছে। বিশাল বিশাল চুল। লম্বা দাঁড়ি। নাম জানালো মামুন। কথায় কথায় জানলাম, আমার পাঁচ ব্যাচ সিনিয়র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েল সাংবাদিকতার ছাত্র।

প্রথম দিনেই, মামুনের সহজ স্বীকারোক্তি-ভাই আমি সাংবাদিকতার ছাত্র। পড়াশোনা করে রেজাল্ট ভালো করেছি। কিন্তু জীবনে এই প্রথম পত্রিকায় কাজ করতে এলাম। একুট সাহায্য করবেন। প্রথম দিনেই এমন সহজ স্বীকারোক্তি আমার দারুণ লাগলো।

শুরুতে মামুনকে দেওয়া হলো ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে। বেচারা আন্তর্জাতিক নিউজ করে অভ্যস্ত ছিল না। ফলে মাঝে মাঝেই সমস্যায় পড়তো। আমি চেষ্টা করতাম সাহায্য করার। যাই হোক, ধীরে ধীরে মামুন প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলো। রাতের শিফটে মূল বার্তা বিভাগে চলে এলো আমার সঙ্গে। বয়সে পাঁচ বছরের বড় হওয়ার পরেও আমার সঙ্গে তাঁর চরম ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেলো। এতো বেশি ঘনিষ্ঠতা যে আমি ওকে তুই করে বলতে শুরু করলাম। সেও তাই। অথচ মামুনের বন্ধুরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বড় ভাই। তাদের সবাইকে আমি আবার আপনি বলি।

যাই হোক সাড়ে তিন বছর আমরা একসঙ্গে কাজ করলাম। আমি এই তিন বছরে মুগ্ধ হয়ে দেখেছি একজন সংগ্রামী মানুষকে। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা। অনেক বেশি স্বচ্ছলতা হয়তো ছিলো না আমাদের, কিন্তু জীবনে সেভাবে কখনো অভাবও ছিল না। কাজেই আনন্দেই কেটেছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দ্বিতীয় বর্ষ থেকে আমি সাংবাদিকতা করি। বাবার পাঠানো টাকা-এরপর বেতন। সব মিলিয়ে মহা আনন্দে ছিলাম। কথায় কথায় মামুন একদিন আমাকে বললো, ‌তুই তো কখনো অভাবে পড়িসনি। টাকার অভাবে পড়িসনি। তুই অভাব বুঝবি কি?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুই-তো আমার সমান বেতন পাস? টাকা কি করিস? মামুন জানালো ওর জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। ওর বাবা যাত্রা পালা করতো। বছরে ছয় মাস সে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ান। তিনি সত্যিকারের শিল্পি মানুষ। তাই আর্থিক অস্বচ্ছলতা ছিল চরম। জমি জমা বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে ওর বাবার অনেক ঋন হয়ে গেছে। তাই বেতনের বেশিরভাগ টাকা ও বাড়িতে পাঠায় সেই ঋন শোধের জন্য। এছাড়া বোনের পড়াশোনার খরচ চালায়।

মামুন জানালো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ওর জীবন যুদ্ধের গল্প। এসব গল্প শুনে আমার চোখ ভিজে এলো। পাছে ও দেখে ফেলে তাই কাঁদলাম না। যাই হোক, একদিন দুইদিন অফিস থেকে ওকে আমার জহরুল হক হলে নিয়ে আসতাম। আমাদের হলের পুকুর পাড়ে বসে ও গান গাইতো। লালন গীতি। ও অসাধারণ গান গাইতো। একসঙ্গে শিপন ভাইয়ের বাসায় খেতে যাওয়া, দিনের পর দিন আড্ডা, লেট নাইট, ঝগড়া-অভিমান আরো কতো কি করে দেখতে দেখেতে তিন বছর কেটে গেলো।

মাষ্টার্সের পড়াশোনার কারণেই আমি মাঝখানে কয়েক মাস দেশে ছিলাম না। মে মাসে দেশে এসে শুনি মামুন প্রথম আলো ছেড়ে কালের কন্ঠে চলে গেছে। সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ আরো কয়েকজন। ওদের অনেক বেতন। ও সিনয়ির সাব এডিটর। আমাদের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হয়ে গেলো। তবে এরপরও নিয়মিত যোগযোগ ছিলো।

ক’দিন আগে হঠাৎ মামুন জানালো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেবে। ২৯ অক্টোবর ওর ভাইভা। মামুন অনার্স ফার্ষ্ট, মাষ্টার্সে রেকর্ড মার্কস নিয়ে ফার্স্ট। কাজেই মেধাবী মামুন নিজ যোগ্যতায় আজ ২৯ অক্টোবর ভাইভা দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলো। সিন্ডেকেটেও পাস হয়ে গেছে। শনিবার মামুন জয়েন করবে। মামুনের বহুদিনের স্বপ্ন সফল হলো। আমার খুবই ভালো লাগছে।

মামুন জানানোর আগেই আমি জানলাম ও শিক্ষক হয়ে গেছে। মামুনকে শুভেচ্ছা জানালাম ফোন করে। আমার খুব ভালো লাগছে। সংগ্রামী এক বন্ধুর বিজয় দেখলাম। মামুন তুমি এগিয়ে যাও। তোমায় সালাম। তোমাকে দেখে শিখুক তরুণ প্রজন্ম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.