সাংবাদিকের জন্য আর্তি

Spread the love

পঙ্গু হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করা হাসান মিজবাহ এই মুহুর্তে জীবন জীবিকা বন্ধু বান্ধব স্বজনদের নিয়ে কী ভাবছে আমার জানা নেই। ছেলেটির সঙ্গে আমার সেভাবে পরিচয়ও নেই। কিন্তু গত দুদিন ধরে সেই আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। শুনলাম আজ ৩ জানুয়ারি ওর জন্মদিন। জীবনের সবচেয়ে সংকটময় জন্মদিনে হাসপাতালে বসে কী ভাবছে ছেলেটা?
হাসান মিজবাহ ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের রিপোর্টার। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে একুশে টেলিভিশন থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্টে যোগ দিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পাস করা ছেলেটিকে শান্ত হিসেবেই জানে তার বন্ধুরা। এনটিভিতে কাজ করা ওর বন্ধু আরাফাত দুপুরে আমাকে জানালো, হাসান নাকি খুব সতর্কতার সাথে মোটর সাইকেল চালাতো। যে ওর পেছনে যে বসতো সে খুব বিরক্ত হতো কারন খুব স্লো চালায়। পৌর নির্বাচনের দিন মানে গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে নয়টায় মোটরসাইকেলে করে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে যাওয়ার পথে বিজয় স্মরণীতে এলে একটি মাইক্রো তার ডান পায়ে চাপা দিয়ে চলে যায়। হাড় ভেঙ্গে পা পুরো থেতলে গেছে।
আমাদের দেশটা বিশেষ করে ঢাকা শহর এতোই মানবিক যে শত শত লোক রাস্তায় থাকলেও শুধুমাত্র একজন মহিলা তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যায়। বাকিরা সব দায়িত্ব এড়িয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রথম তিনদিন নাকি ফ্লোরেই পড়ে ছিলো ছেলেটি। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও কয়েকজনের ফোনের পর একটা কেবিনের ব্যবস্থা হয়েছে।হাসানের পায়ের মাংস থেতলে গিয়ে খুব খারাপ অবস্থা। এখন সে পঙ্গু হাসপাতালে ২০৮ নম্বর কেবিনে আছে।
৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর প্রাথমিকভাবে হাসানের দুটো অপারেশন হয়েছে। তবে আসল অপারেশন নাকি এখনো হয়নি, শুধুমাত্র মাংসগুলো রিবিল্ড করার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। এরপর আরো তিনটে অপরাশেন করতে হবে কিন্তু পা’য়ের অবস্থা এখুনি সেটার জন্য তৈরি নয়। চিকিৎসক জানিয়েছেন, ভালো ট্রিটমেন্ট করাতে তাকে বিদেশেও নিতে হতে পারে।
হাসানের বাবা দিনাজপুরের এক কলেজ শিক্ষক। একেবারেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার।
মাত্র ক’দিন আগে হাসান বিয়ে করেছে। গত তিন চারদিনে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। হাসাসের পরিবারের সবাই দিনাজপুর থেকে চলে এসেছেন। খরচের মাত্রাটা পারদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। একজন সাংবাদিক যে বেতন পায় তাতে বউ নিয়ে বাসা ভাড়া করে ঢাকা শহরে থাকা কী জীবনযুদ্ধ সেটা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই। আজকে হাসানের জায়গায় আমি শরিফুল হাসান থাকলে কী হতো?ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। সত্য কথা হলো আমার পরিবারের এতো টাকা নেই। কারো কাছে হাত পাতা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কঠিন সংকট।
আমি জানি না হাসানের টিকিৎসার টাকা কোথা থেকে আসবে কীভাবে আসবে? ইন্ডিডেনডেন্ট টেলিভিশন বা বেক্সিমকোর জন্য তাদের একজন রিপোর্টারকে সুস্থ করতে ১০-১৫-২০ লাখ টাকা খরচ করা কী খুব কঠিন? আমি জানি মোটেও কঠিন নয়। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের মানসিকতার। একজন রিপোর্টার যখন বিপদে পড়ে তখন তারচেয়ে অসহায় আর কেউ নেই। আমি জানি না ইন্ডিপেনডেন্ট কতো টাকা দেবে। আর আমাদের দেশে সাংবাদিকতরা যেখানে সবচেয়ে বেশি ঝুকিঁর মধ্যে থাকে সেখানে তাদের লাইফ ইনসুরেন্সটাও করা নেই।
হাসান খুব শান্ত ছেলে। এই বিপদের দিনে তাকে নিয়ে লেখা কিংবা স্ট্যাটাস দেয়ার চেয়েও বেশি জরুরী তার চিকিৎসার জন্য মিডিয়াকর্মীদের সহায়তা। আমাদের দেশের গণমাধ্যম মালিক, প্রেসক্লাব, ইউনিয়ন এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সরকার অনেক দুস্থ সাংবাদিককে টাকা দেয়। সেটা নিয়ে কী হয় সেটা নিয়েও কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
আমার যদি সামর্থ্য থাকতো আমি এসব লেখালেখি না করে ডাক্তারদের বলতাম ওর বেস্ট টিটমেন্ট করেন। এমন সম্ভাবনাময় ছেলে আমাদের দরকার। যতো টাকা লাগে আমি দেবো। কিন্তু অামার সেই সামর্থ্য নেই। তবে লাখ-কোটি টাকা দিতে না পারি কয়েকহাজার টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার আছে। একইভাবে আরো অনেকেরই আছে। আমরা একশজন সাংবাদিক যদি নুন্যতম দুই হাজার টাকা করে দেই এই মুহুর্তে দুইলাখ টাকা যোগাড় করা সম্ভব। আরে বেশি লোক আরো বেশি টাকা নিয়ে এগিয়ে এলে সেটাকে ২০ লাখ করা সম্ভব। অনেকের হয়তো টাকা দেয়ার ক্ষমতা নেই কিন্তু এর ওর সঙ্গে যোগাযোগ আছে। আপনি তাহলে সেই যোগাযোগ কাজে লাগাতে পারেন।
একজন বুড়ো মানুষ মরে গেলে আমার কোন আফসোস থাকতো না। কিন্তু হাসানের পুরো জীবনটা পড়ে আছে। অসম্ভব সম্ভাবনাময় ও মেধাবী এই সাংবাদিক ক’দিন আগেও স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদনের জন্য তথ্যমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনার আদ্যোপান্ত নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন করেছে হাসান। কিন্তু আজ নিজেই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়।এরচেয়ে করুণ আর কী হতে পারে?
শুনলাম আজ সন্ধ্যায় নাকি ইটিভির ওখানে ওর চিকিৎসা সংক্রান্ত একটা মিটিং আছে। পারলে সেখানে যোগ দিন। না পারলেও সমস্যা নেই। আপনি যেভাবে পারেন ছেলেটার পাশে থাকেন। সবাইকে পাশে থাকতে বলুন। আমার অনুরোধ চলুন আমরা সবাই মিলে একটা তহবিল গঠন করি বা সংশ্লিষ্টদের করতে বলি যেখানে একজন সাংবাদিক অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে এমনিতেই তাকে সহায়তা করা হবে। রাষ্ট্রের কাছে আমার অনুরোধ আপনারা প্লিজ এই ছেলেটার পাশে থাকুন।
আজ ৩ জানুয়ারি। হাসান আজ তোমার জন্মদিন। প্রিয় ছোট ভাই তোমাকে একটা কথাই আজকে আমি বলতে চাই তুমি একা নও। তোমাকে সুস্থ করার লড়াইটা আমাদের সবার। আমরা সবাই মিলে আবার তোমাকে সুস্থ করে আনবো। তুমি আবার মাঠে নামবে। যে পা ভেঙ্গেছে সেই পায়ের উপর শক্ত করে ভর করে, হাতে বুম নিয়ে রিপোর্ট শেষে সারা দুনিয়াকে শুনিয়ে বলবে, মিজবাহ হাসান, ইন্ডিপেনডেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.